ডাঃ সুনিপ ব্যানার্জী এবং ডাঃ সৌরেন্দ্র শঙ্কর দাস
সমকালীন প্রতিবেদন : হঠাৎ হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে রাস্তাঘাট, অফিস, বাড়ি কিংবা গণপরিবহণে কেউ অচৈতন্য হয়ে পড়লে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে, তা জানা অত্যন্ত জরুরি। এমন আপৎকালীন পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি সঠিক পদ্ধতিতে সিপিআর (কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন) দিতে পারলে অনেক ক্ষেত্রেই জীবন বাঁচানোর সুযোগ তৈরি হয়। তাই চিকিৎসকদের মতে, শুধু স্বাস্থ্যকর্মী নয়, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে পুলিশকর্মী, অফিসের কর্মী এবং স্কুল-কলেজের পড়ুয়াদেরও সিপিআর প্রশিক্ষণ নেওয়া প্রয়োজন। বিশ্ব হৃদয় দিবস উপলক্ষে সিপিআর সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রত্যেকের প্রশিক্ষণ নেওয়ার আহ্বান জানালেন দক্ষিণ কলকাতার হৃদ্রোগের পরিচিত চিকিৎসাকেন্দ্র কলকাতা হার্ট লাং সেন্টারের দুই চিকিৎসক।
বর্তমানে অনিয়মিত জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চার অভাব এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি ঝোঁক বাড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকেরা। অতিরিক্ত তেল-মশলায় তৈরি খাবারের পরিবর্তে সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার উপরেও জোর দিয়েছেন তাঁরা। শাকসব্জি, শাকপাতা এবং প্রয়োজনীয় উদ্ভিজ্জ ও প্রাণিজ প্রোটিন খাদ্যতালিকায় রাখার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন জরুরি বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
কলকাতা হার্ট লাং সেন্টারের সিনিয়র ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট ডাঃ সুনিপ ব্যানার্জী জানান, হৃদ্রোগের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ কারও হৃদ্স্পন্দন ও স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি সিপিআর সম্পর্কে প্রশিক্ষিত ব্যক্তির সাহায্য নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে হাসপাতালে পৌঁছনোর আগের সময়টুকু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে সঠিকভাবে সিপিআর দেওয়া গেলে মস্তিষ্ক ও শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে রক্ত সঞ্চালন বজায় রাখতে সাহায্য করা সম্ভব। তাঁর মতে, রাস্তাঘাট, ট্রেন, বাস কিংবা বাড়িতে কেউ হঠাৎ অচৈতন্য হয়ে পড়লে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা পরিষেবায় খবর দেওয়ার পাশাপাশি পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রাথমিক জীবনরক্ষাকারী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। সিপিআর সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে ব্যাপক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
কলকাতা হার্ট লাং সেন্টারের কনসালট্যান্ট ফিজিশিয়ান (কার্ডিও ও ডায়াবেটিস) এবং সিপিআর প্রশিক্ষক ডাঃ সৌরেন্দ্র শঙ্কর দাস বলেন, সিপিআর একটি জীবনরক্ষাকারী জরুরি চিকিৎসাপদ্ধতি। তবে এই পদ্ধতি দেওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কীভাবে বুকের মাঝখানে চাপ দিতে হয়, কতক্ষণ ধরে তা চালিয়ে যেতে হয় এবং কোন পরিস্থিতিতে মুখে শ্বাস দেওয়া প্রয়োজন, সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। তাঁর মতে, শুধু প্রশিক্ষণ নিলেই হবে না, নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে সেই জ্ঞান ধরে রাখতে হবে। প্রত্যেকের জীবনে অন্তত একবার স্বীকৃত প্রশিক্ষকের কাছ থেকে সম্পূর্ণ সিপিআর প্রশিক্ষণ নেওয়া উচিত। স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমেও সিপিআর প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে ভাবনাচিন্তা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বুকের ব্যথাকে সাধারণ গ্যাসের সমস্যা ভেবে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
হৃদ্রোগ প্রতিরোধে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার উপরেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন দুই চিকিৎসক। তাঁদের পরামর্শ, ৪০ বছর পেরোলেই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত। ডায়াবেটিস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় অন্তর লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা করানো জরুরি। পাশাপাশি নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করতে হবে। উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খেতে হবে। নিজের ইচ্ছায় ওষুধ বন্ধ করা বা বুকে ব্যথা হলে নিজে থেকে ওষুধ খাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, হৃদ্রোগের ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে প্রাথমিক চিকিৎসা, দুটিরই গুরুত্ব অপরিসীম। তাই সিপিআর প্রশিক্ষণকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা এবং নিয়মিত অনুশীলনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। বিশ্ব হৃদয় দিবসে তাঁদের বার্তা, সিপিআর শিখুন, সচেতনতা বাড়ান এবং জরুরি পরিস্থিতিতে মানুষের পাশে দাঁড়ান। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপই হয়ে উঠতে পারে কারও জীবন বাঁচানোর গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন