সমকালীন প্রতিবেদন : মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় বনগাঁ রেল স্টেশন চত্বরে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন এক অন্তঃসত্ত্বা মহিলা। পরিচয় বা ঠিকানা কিছুই জানা ছিল না তার। এমন পরিস্থিতিতে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করানো থেকে শুরু করে প্রসবকালীন চিকিৎসা এবং সন্তান প্রসবের পর মা ও শিশুর সুরক্ষার ব্যবস্থা– সমস্ত ক্ষেত্রেই মানবিক উদ্যোগের নজির তৈরি করল বনগাঁ রেল পুলিশ ও বনগাঁ মহকুমা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। চিকিৎসকদের তৎপরতায় বর্তমানে মা ও সদ্যোজাত দু’জনেই সুস্থ রয়েছেন।
ঘটনার সূত্রপাত গত ৫ আগস্ট। ওই দিন বনগাঁ রেল স্টেশন চত্বরে এক ভবঘুরে অন্তঃসত্ত্বা মহিলাকে ঘোরাফেরা করতে দেখেন রেল পুলিশের কর্মীরা। তার শারীরিক ও মানসিক পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তাকে উদ্ধার করে দ্রুত বনগাঁ মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালে ভর্তি করার পর তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেন প্রসূতি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. জগত বিশ্বাস।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যপরীক্ষাতেই ধরা পড়ে, ওই মহিলার শরীরে রয়েছে তীব্র রক্তাল্পতা। পরিস্থিতি বিবেচনা করে দ্রুত তার শরীরে রক্ত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি চিকিৎসকদের নজরদারিতে রাখা হয় তাকে। একদিকে গর্ভাবস্থার জটিলতা, অন্যদিকে মানসিক অসুস্থতার কারণে পুরো বিষয়টিই ছিল চিকিৎসকদের কাছে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের।
এরপর ১৯ আগস্ট হঠাৎ করেই প্রসূতির শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। পরিস্থিতি বুঝে আর কোনও ঝুঁকি নিতে চাননি চিকিৎসকেরা। ডা. জগত বিশ্বাসের নেতৃত্বে চিকিৎসকদের একটি দল জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেয়। সফল অস্ত্রোপচারের পর ওই মহিলা একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন।
তবে জন্মের পরও শেষ হয়নি চিকিৎসকদের দায়িত্ব। শিশুটির ওজন কম থাকায় তাকে বিশেষ পর্যবেক্ষণের জন্য হাসপাতালের স্পেশাল নিউবর্ন কেয়ার ইউনিটে রাখা হয়। সেখানে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নজরদারিতে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে সদ্যোজাত। অন্যদিকে, জটিল অস্ত্রোপচারের পর মাকে রাখা হয় হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে। শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি তার মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। দেওয়া হয় প্রয়োজনীয় সাইকিয়াট্রিক চিকিৎসা।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় ওই মহিলার পরিচয়। চিকিৎসকদের কাছে নিজের নাম বা ঠিকানা কিছুই বলতে পারছিলেন না তিনি। ফলে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছিল না। শিশুটির ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে আইনি প্রক্রিয়া এবং সরকারি নিয়ম মেনে সদ্যোজাতকে বারাসতের চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির প্রতিনিধিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সেখানে শিশুটির নিরাপদ আশ্রয় ও প্রয়োজনীয় পরিচর্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
হাসপাতালের প্রসূতি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. জগত বিশ্বাস জানান, রেল পুলিশের মাধ্যমে ওই মহিলাকে হাসপাতালে আনার পর তার প্রয়োজনীয় সমস্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। চিকিৎসকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই তিনি সুস্থ সন্তানের জন্ম দিতে পেরেছেন। তবে এখনও ওই মহিলা নিজের নাম-ঠিকানা জানাতে পারছেন না। সেই কারণে তাকে পরিবারের কাছে ফেরানো কিংবা অন্যত্র উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানোর ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে।
বর্তমানে ওই মহিলা শারীরিকভাবে অনেকটাই সুস্থ। তাকে হাসপাতালের জেনারেল ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ চলছে। একইসঙ্গে তার পরিচয় এবং পরিবারের সন্ধান পাওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। একজন পরিচয়হীন, অসহায় এবং মানসিক ভারসাম্যহীন প্রসূতির পাশে দাঁড়িয়ে শুধু চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়াই নয়, তার সন্তানকে নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করাও এই ঘটনার বিশেষ দিক।








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন