সমকালীন প্রতিবেদন : একুশে জুলাইয়ের মেগা সমাবেশের ঠিক আগের দিন রাজ্য রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রাজভবন বা বাইরের কোনও রাজনৈতিক মঞ্চ নয়, খোদ বিধানসভার অধিবেশনে ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাইয়ের ঐতিহাসিক ও বিতর্কিত ঘটনার তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট পেশ করলেন তিনি। তৎকালীন তৃণমূল সরকারের গঠিত বিচারপতি সুশান্ত কুমার চট্টোপাধ্যায় কমিশনের সেই রিপোর্টের মূল অংশ পাঠ করে বিরোধী শিবির এবং তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বকে একযোগে কাঠগড়ায় দাঁড় করান মুখ্যমন্ত্রী।
১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই তৎকালীন বাম জমানায় সচিত্র পরিচয়পত্রের দাবিতে যুব কংগ্রেসের মহাকরণ অভিযানকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রের চেহারা নিয়েছিল কলকাতা। পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয়েছিল ১৩ জন কর্মীর। ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসেই এই ঘটনার নেপথ্যের সত্য উদ্ঘাটনে বিচারপতি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তদন্ত কমিশন গঠন করেছিলেন তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু দীর্ঘ ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি। অবশেষে ৩৩ তম ২১ জুলাইয়ের প্রাক্কালে সেই রিপোর্ট বিধানসভায় পেশ করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, “তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব মণীশ গুপ্তের নির্দেশেই সেদিন গুলি চলেছিল। রাইটার্স বিল্ডিংয়ে বিক্ষোভ আছড়ে পড়ার আশঙ্কা সম্পূর্ণ কাল্পনিক ছিল। ফলে মেয়ো রোড বা ডোরিনা ক্রসিংয়ে পুলিশি গুলিচালনা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় ও উস্কানিহীন।”
মুখ্যমন্ত্রী এদিন তীব্র আক্রমণ শানিয়ে বলেন, ২১ জুলাইয়ের আবেগকে পুঁজি করে অনেকে রাজনৈতিক পদ ও সরকারি ক্ষমতা ভোগ করেছেন, চার্টার্ড ফ্লাইটে ঘুরেছেন কিংবা হরিশ চ্যাটার্জি ও হরিশ মুখার্জি স্ট্রিটে ৩৮টি প্লটের মালিক হয়েছেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ১১ কোটি মানুষ প্রকৃত সত্য জানতে পারেনি। শুভেন্দুর অভিযোগ, যে মণীশ গুপ্তের নির্দেশে গুলি চলেছিল, তাঁকেই পরবর্তীতে নিজেদের মন্ত্রিসভায় জায়গা দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা করেছিল তৎকালীন তৃণমূল সরকার। আর সেই মণীশ গুপ্তকে বাঁচাতেই পনেরো বছর ধরে এই তদন্ত রিপোর্ট ফাইলবন্দি করে রাখা হয়েছিল।
বিধানসভায় ৪৪ জন সাক্ষীর তালিকা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী এক চাঞ্চল্যকর প্রশ্ন তোলেন। তিনি জানান, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, মণীশ গুপ্ত, তুষার তালুকদার, বিমান বসু বা সোমেন মিত্রের মতো প্রথম সারির নেতাদের কমিশন ডাকলেও, ঘটনার মূল সাক্ষী ও নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন ডাকা হয়নি, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। পাশাপাশি, তৎকালীন মন্ত্রিসভার সদস্য প্রয়াত পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক বিবৃতি উদ্ধৃত করে তিনি জানান, পঙ্কজবাবু এই কমিশনে সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করেছিলেন। কারণ, যাঁর নির্দেশে গুলি চলেছিল, তাঁকেই যখন সরকারে মন্ত্রী করা হয়েছে, তখন এই সাক্ষ্যদান অযৌক্তিক বলে মনে করেছিলেন তিনি।
কমিশনের রিপোর্টের নির্যাস উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, মহাকরণ থেকে এই সংক্রান্ত বহু প্রাসঙ্গিক নথি ও তথ্য গায়েব করে দেওয়া হয়েছিল, যা নিয়ে তৎকালীন সরকারের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত উদাসীন ও নেতিবাচক। এছাড়া, কমিশন নিহতদের পরিবারকে ২৫ লক্ষ এবং আহতদের ৫ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুপারিশ করলেও, তৎকালীন সরকার নিহতদের মাত্র ২ লক্ষ ও আহতদের ১৫ হাজার টাকা দিয়ে দায় সেরেছিল।
এই বঞ্চনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এদিন এক বড় ঘোষণা করেন। তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলি চাইলে এই ঘটনায় নতুন করে পুলিশে এফআইআর দায়ের করতে পারে। বর্তমান সরকার তাদের সবরকম আইনি সাহায্য দেবে। একই সঙ্গে, কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী মূল ক্ষতিপূরণের বাকি টাকা মুখ্যমন্ত্রী ত্রাণ তহবিল থেকে মিটিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকারও করেন তিনি।
বক্তব্যের শেষে শুধু ২১ জুলাইয়ের রিপোর্টই নয়, আগামী দিনে আমফানের ক্যাগ রিপোর্ট থেকে শুরু করে কোভিড পর্যায়কালীন চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার সমস্ত ‘দুর্নীতি সম্পর্কিত’ রিপোর্টও এক এক করে বিধানসভার টেবিলে পেশ করে আমজনতার সামনে নিয়ে আসার হুঁশিয়ারি দেন মুখ্যমন্ত্রী।








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন