সমকালীন প্রতিবেদন : পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কার্যকলাপে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা হতে চলেছে। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে রাজ্যের সমস্ত স্তরের সরকারি ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হলো। সোমবার বিধানসভা অধিবেশনে এই ঐতিহাসিক ঘোষণাটি করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একই সঙ্গে তিনি জানান, এখন থেকে রাজ্য সরকারের অভ্যন্তরীণ সমস্ত চিঠিপত্র ও বিজ্ঞপ্তি বাংলা ভাষায় আদান-প্রদান করা হবে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিদেশি ভাষা ইংরেজির ব্যবহার পুরোপুরি বর্জন করে বাংলা ও হিন্দি ভাষায় চিঠিপত্র আদান-প্রদান করা হবে।
এই নাটকীয় ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের নেপথ্যে রয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পাঠানো একটি বিশেষ চিঠি। রবিবার হাওড়ার আমুল কারখানার শিলান্যাস অনুষ্ঠানের মঞ্চেই মুখ্যমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, বাংলা ভাষা ও তার সুদীর্ঘ ঐতিহ্য নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁকে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ চিঠি লিখেছেন, যা তিনি সোমবার বিধানসভায় পেশ করবেন।
সেই কথামতো, সোমবার বেলা ১১টায় বিধানসভার অধিবেশন শুরু হতেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সেই চিঠিটি পড়ে শোনান। চিঠির ছত্রে ছত্রে বাংলা ভাষার সুদীর্ঘ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বর্ণনা ছিল। এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজেও গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, “বাংলা আবার সোনার বাংলা হয়ে ওঠার দিকে এগোচ্ছে। আমি আবেগঘন হয়ে শুভেন্দুকে আমার মনের কথা লিখে একটি চিঠি পাঠিয়েছি এবং আশা করছি মুখ্যমন্ত্রী আমার প্রস্তাব রাখবেন।”
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চিঠিতে মূলত দুটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রস্তাব ও পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, যা পশ্চিমবঙ্গ সরকার সাদরে গ্রহণ করেছে। সেগুলি হল– বাংলা ভাষার গৌরবময় ইতিহাসকে সম্মান জানাতে রাজ্যের সমস্ত সরকারি কাজে বাংলাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেন অমিত শাহ। সেই পরামর্শ মেনে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে সচিবালয়, প্রতিটি সরকারি দপ্তর, বিজ্ঞপ্তি থেকে শুরু করে স্থানীয় থানার দৈনন্দিন কাজও বাধ্যতামূলকভাবে বাংলা ভাষায় পরিচালিত হবে।
চিঠিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দ্বিতীয় বড় প্রস্তাব ছিল, কেন্দ্র ও রাজ্যের পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিদেশি ভাষা ইংরেজিকে বাদ দিয়ে হিন্দি ভাষার ব্যবহারে জোর দেওয়া। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই কাজে কেন্দ্রের 'রাজভাষা বিভাগ'-এর সফটওয়্যার ব্যবহারেরও উল্লেখ করেন, যেখানে ভারতীয় ভাষা সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই প্রস্তাবকে সম্মান জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, এখন থেকে কেন্দ্রকে পাঠানো সমস্ত চিঠিপত্র আর ইংরেজিতে নয়, বরং হিন্দিতে লেখা হবে। রাজভাষা হিসেবে হিন্দির ব্যবহার বাড়াতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার সম্পূর্ণ তৎপর।
হুট করে এই নিয়ম চালু করলে প্রশাসনিক কাজে যাতে কোনো জটিলতা বা বিঘ্ন না ঘটে, তার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কিছুটা সময় নেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, সরকারি কাজ সহজ করার লক্ষ্যে প্রশাসনিক পরিভাষা ও প্রয়োজনীয় নথিপত্রের যথাযথ অনুবাদ সম্পন্ন করতে আগামী প্রায় দেড় মাস সময় লাগবে। এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে সরকার অনুবাদের সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করবে এবং ১ সেপ্টেম্বর থেকে এটি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হবে।
মুখ্যমন্ত্রীর এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তকে সোমবার অধিবেশন কক্ষে উপস্থিত শাসক ও বিরোধী– সব দলের সদস্যরা একযোগে স্বাগত জানান। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের প্রেক্ষিতে বিধানসভার অধ্যক্ষ রথীন্দ্রনাথ বসু অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘‘আমি অধ্যক্ষের দায়িত্ব পাওয়ার পর অমিত শাহজিকে জানিয়েছিলাম যে, আমি বিধানসভার সমস্ত অধিবেশন পুরোপুরি বাংলা ভাষায় পরিচালনা করতে চাই। তিনি আমার সেই মতামতকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছিলেন। আজ এই চিঠির মাধ্যমে আমি নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারলাম। মাননীয় অমিত শাহজি ও মুখ্যমন্ত্রীকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ। এর মাধ্যমে আমরা বাংলা ভাষাকে আরও বৃহৎ পরিসরে ছড়িয়ে দিতে পারব।”








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন