সমকালীন প্রতিবেদন : সকালের হালকা আলো ফুটতেই বনগাঁ স্টেডিয়ামে চেনা ছবির কোলাহল। মাঠের এক কোণে একদল মানুষকে নানারকম কসরত করাচ্ছেন এক প্রৌঢ়। কখনো প্রাণায়াম, কখনো ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ, আবার কখনো কঠিন কিছু আসন। আর কোনো পেশাদার ট্রেনার নন, বরং শরীরচর্চাকে ভালোবেসে বিগত ২৩ বছর ধরে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই কাজ করে চলেছেন বনগাঁরই বাসিন্দা, পেশায় ব্যবসায়ী তারক ঘোষ। তাঁর হাত ধরেই আজ বনগাঁর এক বড় অংশের মানুষ ফিরে পাচ্ছেন তাঁদের হারিয়ে যাওয়া স্বাস্থ্য।
আজ থেকে প্রায় দুই দশক আগে, ২০০৩ সালে শরীরচর্চার প্রতি এক অদ্ভুত টান থেকে বনগাঁ স্টেডিয়ামে এই মহৎ উদ্যোগের সূচনা করেছিলেন তারকবাবু। পেশাগতভাবে তিনি ব্যবসায়ী হলেও, নেশা ও ভালোবাসায় তিনি পুরোদস্তুর একজন ট্রেনার। কোনো রকম আর্থিক লাভের আশা না করে, শুধু মানুষকে সুস্থ রাখার তাগিদে তিনি প্রতিদিন সকালে নিয়ম করে মাঠে হাজির হন।
বর্তমানে তাঁর এই উদ্যোগ একটি সুসংগঠিত রূপ নিয়েছে। গড়ে উঠেছে ‘সবুজ সংঘ’ নামের একটি সংস্থা। শুরুর দিকে হাতেগোনা কয়েকজনকে নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও, বর্তমানে এই ক্লাবের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৫০ জন। তারকবাবুর এই ‘সবুজ সংঘ’-এর সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো এখানে সমাজের সব স্তরের ও সব বয়সের মানুষের অবাধ যাতায়াত। পুরুষদের পাশাপাশি এই দলে নিয়মিত যোগ দিচ্ছেন মহিলারাও। প্রতিদিন সকালে তারকবাবুর কড়া নজরদারিতে চলে নানারকম শারীরিক কসরত।
এই ক্লাবে নিয়মিত যোগ দিয়ে উপকৃত হয়েছেন অনেকেই। সুমন, আনন্দ, মানিক, বিশ্বজিৎ বিশ্বাসদের মতো সদস্যদের মুখ থেকেই জানা গেল তারকবাবুর এই অবদানের কথা। বর্তমান যুগের অনিয়মিত জীবনযাত্রার কারণে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা থাইরয়েডের মতো ‘লাইফস্টাইল ডিজিজ’ ঘরে ঘরে। সবুজ সংঘের সদস্যদের দাবি, নিয়মিত এখানে ব্যায়াম করার ফলে তাঁদের এই সমস্ত ক্রনিক রোগ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ভুগছিলেন নানারকম শারীরিক সমস্যায়। কিন্তু তারকবাবুর দেখানো পথে হেঁটে আজ তাঁরা ওষুধ ছাড়াই সুস্থ ও সতেজ বোধ করছেন।
দিনের পর দিন, বছরের পর বছর একসাথে সকালে শরীরচর্চা করতে করতে ‘সবুজ সংঘ’ আজ আর পাঁচটা সাধারণ ক্লাবের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। সদস্যদের কথায়, এটি এখন একটি পরিবারে পরিণত হয়েছে। সুখ-দুঃখে প্রত্যেকে প্রত্যেকের পাশে দাঁড়ান। আর এই গোটা পরিবারের অভিভাবক বা ‘ক্যাপ্টেন’ হলেন তারক ঘোষ স্বয়ং।
সবুজ সংঘের প্রতিষ্ঠাতা তারক ঘোষ জানালেন, "মানুষকে সুস্থ দেখতে পাওয়াটাই আমার সবচেয়ে বড় পারিশ্রমিক। আজকের ব্যস্ত জীবনে মানুষ নিজের শরীরের যত্ন নিতে ভুলে যাচ্ছে। আমি শুধু তাদের একটু পথ দেখানোর চেষ্টা করি মাত্র। যতদিন শরীরে শক্তি আছে, এই কাজ করে যাব।"
আজকের দিনে যখন সব কিছুর পেছনেই একটা ব্যবসায়িক মানসিকতা জড়িয়ে থাকে, সেখানে দাঁড়িয়ে তারক ঘোষের এই নিঃস্বার্থ সমাজসেবা সত্যিই এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে। বনগাঁ স্টেডিয়ামের এই ‘সবুজ সংঘ’ আগামী দিনে আরও বহু মানুষকে সুস্থ জীবনের আলো দেখাবে, এমনটাই আশা স্থানীয় বাসিন্দাদের।








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন