Breaking

Post Top Ad

Your Ad Spot

শনিবার, ১২ নভেম্বর, ২০২২

Tour : আমেদাবাদের সবরমতি আশ্রম ও অক্ষয় ধাম

Sabarmati-Ashram-and-Akshaya-Dham-in-Ahmedabad

আমেদাবাদের সবরমতি আশ্রম ও  অক্ষয় ধাম 

অজয় মজুমদার


১৩ অক্টোবর, ২০২২ সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা বেরিয়ে পড়ি আমেদাবাদের উদ্দেশ্যে। দূরত্ব ১০১ কিলোমিটার। আমাদের সঙ্গী ছিল ৪৫ সিটের একটি এসি বাস। সেই বাসে চেপে আমরা এলাম কোহিনুর প্লাজা (হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট), ২২ তিলকনগর সোসাইটি, নেয়ার এম টি এস বাস স্ট্যান্ড, আশ্রম রোড, আমেদাবাদ- ৩৮০০১৩৷ হোটেলে আমাদের রান্নার জিনিস এবং কর্মীদের নামিয়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আমেদাবাদের আশপাশের এলাকা দর্শনে৷ লাঞ্চ আমাদের সঙ্গেই ছিল৷ ঘোরার মাঝখানে কোনও একটা ধাবায় খেয়ে নিতে হবে। এব্যাপারে আমাদের ম্যানেজার ডাক্তার সাহারুন ভীষণ যত্নবান। দেরি করে খাওয়া চলবে না৷ প্রত্যেকের উপর সমান নজর৷ এবার আমরা পৌঁছলাম সবরমতি আশ্রমে।

এই আশ্রমটি হরিজন আশ্রম অথবা সত্যাগ্রহ আশ্রম নামে পরিচিত৷ সবরমতি নদীর তীরে আমেদাবাদ গুজরাটের আশ্রম রোডে অবস্থিত। এটি মহাত্মা গান্ধীর বহু আবাসস্থলগুলির মধ্যে একটি, যেখানে তিনি কারা ভোগহীন বা ভ্রমণ ব্যতিত সময়ে বাস করতেন৷ তাঁর স্ত্রী কস্তুরবা গান্ধী এবং বিনোবা ভাবে সহ তাঁর অনুগামীদের সঙ্গে মোট ১২ বছর সবরমতি বা ওয়ারধাতে থাকতেন। এই আশ্রমের নিয়ম মতো প্রতিদিন ভাগবত গীতা পাঠ করা হতো। 

গান্ধীজীর ভারত আশ্রমটি মূলত ১৯৫৫ সালের ২৫ মে গান্ধীর ব্যারিস্টার বন্ধু জীবনলাল দেশাই এর কোচবর বাংলোয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল৷ এই সময় এই আশ্রমকে সত্যগ্রহ আশ্রম বলা হতো৷ গান্ধীজীর অন্যান্য কাজকর্ম ছাড়াও এখানে কৃষিকাজ ও পশুপালন করা হতো। প্রয়োজনে ১৯১৭ সালে ১৭ জুন আশ্রমটি সবরমতি নদীর তীরে ৩৬ একর জায়গায় স্থানান্তরিত হয়। তখন থেকেই এই আশ্রমটি আশ্রম হিসাবে খ্যাত হয়। 

১৯৩০ সালের ১২ মার্চ গান্ধীজী ব্রিটিশ লবণ আইনের প্রতিবাদে ৭৮ জন সঙ্গী নিয়ে আশ্রম থেকে ১৪১ মাইল দূরে ডান্ডিতে যাত্রা করেছিলেন। গান্ধীর এই প্রতিবাদের কারণ ছিল ব্রিটিশরা তাদের দেশীয় লবণের বিক্রয় বৃদ্ধির প্রয়াসে ভারতীয় লবণের উপর কর বাড়িয়েছিল অন্যায়ভাবে। এই পদযাত্রা পরবর্তী সময়ে লবনের অবৈধ উৎপাদন (গান্ধী সমুদ্রের জলে কিছু নোনতা কাদা সেদ্ধ করেছিলেন) ভারত জুড়ে কয়েক হাজার মানুষকে লবনের বেআইনি উৎপাদন (ইংরেজ আইন অনুযায়ী) ও কেনাবেচার ক্ষেত্রে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করেছিল৷ জনগণের এই অবাধ্যতার কারনে ইংরেজ শাসক ৬০ হাজার মানুষকে বন্দী করেছিল৷ পরবর্তী সময় সরকার আশ্রমটি দখল করে নেয়৷

আশ্রমে এখন একটি যাদুঘর রয়েছে, গান্ধী স্মারক সংগ্রহালয়। গান্ধীজী আশ্রমের বিভিন্ন বিল্ডিং এর নামকরণ ছিল যেমন- নন্দিনী, রুস্তম ব্লক, প্রভৃতি। যাদুঘরে গান্ধী চিত্রশালা- ১৯১৫ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে আমেদাবাদে গান্ধীর জীবনকে নির্দেশ করে৷ উদ্ধৃতি, চিঠিপত্র, গান্ধীর অন্যান্য স্মৃতিচিহ্ন৷ গান্ধী জীবন, কর্ম, শিক্ষা, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন বিষয়ে ৩৫ হাজার বই এবং ইংরেজি, গুজরাটি এবং হিন্দিতে ৮০টিরও  বেশি সাময়িকী সহ একটি পাঠকক্ষ রয়েছে৷ 

গান্ধীর মূল ফটো কপি সহ প্রায় ৩৪ হাজার ১১৭ টি চিঠি, সংগ্রহশালা, হরিজন সেবক, হরিজন বন্ধুতে গান্ধী নিবন্ধের পান্ডুলিপিগুলির প্রায় ৮৭৮১ পৃষ্ঠা এবং গান্ধী ও সহযোগীদের প্রায় ৬ হাজারটি ছবি রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে গান্ধীর খাদি তৈরি করতে ব্যবহৃত চরকা এবং চিঠি লেখার জন্য যে টেবিল ব্যবহার করেছিলেন, সেগুলি সহ কিছু জিনিসপত্র৷ এটি গান্ধী গবেষকদের তীর্থক্ষেত্র বলা চলে। 

এরপর আমরা এলাম অক্ষয় ধামে। অক্ষয় ধাম এর অর্থ হল ঈশ্বরের বাসস্থান৷ গান্ধীনগরের ঐশ্বরিক বাসস্থান এবং নামটি নির্দিষ্ট করে, গান্ধীনগরের অক্ষয় ধাম মন্দিরটি বিএএসপি স্বামীনারায়ণ সংস্থা কর্তৃক স্বামীনারায়ণের সম্মানে নির্মিত হয়েছিল৷ একজন প্রভাবশালী বক্তা, প্রায় ৪০ বছর ধরে জুনাগড়ের স্বামীনারায়ণের মন্দিরের মহন্ত বা প্রধান হিসাবে স্বামীনারায়ণের শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সারা বিশ্বে প্রায় ৪০,০০০ ঋষি এবং ৫৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবকও রয়েছেন। সংস্থাটি বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ব এবং আত্ম উপলব্ধির পদ্ধতি প্রচার করেছিলেন। মহান সামাজিক ও আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে তিনি শুধু হিন্দু নন- ব্রিটিশ, মুসলিম ও খ্রিস্টানদের দ্বারা প্রশংসিত ছিলেন৷

রাজস্থান থেকে ৬ হাজার মেট্রিক টন গোলাপি বেলেপাথর থেকে একটি স্থাপত্যের মাস্টারপিসটি যত্ন সহকারে খোদাই করা হয়েছে৷ মন্দিরে ১.২ টন ওজনের স্বামীনাথনের একটি আশ্চর্যজনক ৭ ফুট লম্বা মূর্তি রয়েছে। এটি কেন্দ্রীয় হলের একটি ৩ ফুট পিঠে স্থাপন করা হয়েছে৷ জাতির কল্যাণে তার দর্শন প্রচারের জন্য ৫০০ জন পরমহংস নিযুক্ত করা হয়েছিল৷ মন্দিরে পবিত্র কমপ্লেক্স যা ১০৮ ফুট উচ্চতায় ১৩১ ফুট প্রস্ত এবং ২৪০ ফুট দৈর্ঘ্য বিস্তৃত কারিগরদের আশ্চর্যজনক স্থাপত্যে তৈরি৷

এই মন্দিরে একটি জঙ্গি হানার ঘটনা ঘটে ২০০২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর৷ মুর্তাজা হাফিজ ইয়াসিন ও আশরাফ আলী মোহাম্মদ ফারুক নামে দুজন জঙ্গি স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ও হ্যান্ডগ্রেনেডের সাহায্যে এই হামলা চালিয়েছিল৷ মন্দিরের বাইরে ডাবের জল পান করে আমরা অনেকটা প্রখর রোদ থেকে মুক্তি পেলাম৷ 

আমাদের সঙ্গে অর্থপেডিক সার্জন স্বপন যেখানে যাচ্ছে, সেখানকার সম্পর্কে স্টাডি করে আসছে৷ আমাকে তো পড়া ধরার মতো প্রশ্ন করছে। আমি না পারলেও রবিদা সব উত্তর দিচ্ছেন। রবিদার আবার ইতিহাসের পাতার সাল, গন, নক্ষত্র কণ্ঠস্থ থাকে। ফিরে এসে একটা ধাবায় আমরা খেয়ে নিলাম বড় পাবদা মাছের ঝোল। কি যে তার টেস্ট, তাও আবার অন্য রাজ্যে বসে। বিশ্রাম নিয়ে আবার চললাম।





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন