সমকালীন প্রতিবেদন : শিক্ষক দিবসের মঞ্চ থেকেই রাজ্যের স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থায় একাধিক বড়সড় সংস্কারের কথা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, শিক্ষকদের বকেয়া মহার্ঘভাতা, পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন এবং স্কুলের পরিকাঠামো উন্নয়ন– একাধিক বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি। তাঁর দাবি, শুধু ভাষণে নয়, কাজের মাধ্যমেই রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হবে। শনিবার নিউ টাউনের কনভেনশন সেন্টারে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিদ্যালয় শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা দফতরের উদ্যোগে আয়োজিত ‘বিদ্যাসাগর শিক্ষা সম্মান ২০২৬’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানেই রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর একাধিক পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
শিক্ষার মান উন্নত করতে প্রতিটি জেলায় আপাতত দু’টি করে ‘সিএম শ্রী’ বা ‘মুখ্যমন্ত্রী শ্রী’ ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই প্রতিষ্ঠানগুলিকে মডেল স্কুল হিসেবে গড়ে তোলা হবে। জওহর নবোদয় বিদ্যালয়ের ধাঁচে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পরীক্ষার মাধ্যমে পড়ুয়া ভর্তি করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলিতে উন্নত পরিকাঠামোর পাশাপাশি আধুনিক ডিজিটাল ল্যাব, স্মার্ট বোর্ড এবং দক্ষ শিক্ষকদের ব্যবস্থা থাকবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সেন্ট্রাল স্কুলের আদলে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানগুলি আগামী দিনে রাজ্যের স্কুলশিক্ষার ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত তৈরি করবে বলেই সরকারের লক্ষ্য।
শিক্ষক নিয়োগ প্রসঙ্গেও এদিন স্পষ্ট অবস্থান জানান শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি, সুপ্রিম কোর্ট এবং কলকাতা হাই কোর্টের সমস্ত নির্দেশ ও গাইডলাইন মেনেই উপযুক্ত সময়ে শিক্ষক নিয়োগ সম্পন্ন করা হবে। কোনও ধরনের অনিয়মের সুযোগ রাখা হবে না বলেও আশ্বাস দেন তিনি। নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষার নম্বরকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, শুধুমাত্র মোবাইলে বার্তা পাঠিয়ে চাকরি দেওয়ার মতো কোনও ব্যবস্থা থাকবে না। যোগ্যতা ও লিখিত পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত নিয়োগের পথে এগোনো হবে বলে জানান তিনি। ইন্টারভিউয়ের নম্বর নিয়েও এসএসসিকে পরামর্শ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, মৌখিক পরীক্ষায় অতিরিক্ত নম্বর থাকলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পক্ষপাতের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাই ইন্টারভিউয়ের নম্বর কমিয়ে মেধার আরও নিরপেক্ষ মূল্যায়নের ব্যবস্থা করার পক্ষে তিনি।
শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের বকেয়া মহার্ঘভাতা নিয়েও এদিন মুখ খোলেন মুখ্যমন্ত্রী। বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন হওয়ায় ইন্দু মলহোত্র কমিটির নির্দেশ অনুযায়ী রাজ্য সরকার পদক্ষেপ করবে বলে জানান তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষাকর্মী, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষাকর্মীদের বকেয়া মহার্ঘভাতা মেটাতে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
তবে একসঙ্গে পুরো অর্থ দেওয়া সম্ভব না হলেও পর্যায়ক্রমে তা মেটানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি পুজোর আগে রাজ্য সরকারি কর্মীদের আগাম বেতন দেওয়ার কথাও জানান মুখ্যমন্ত্রী। এর সঙ্গে ২০ শতাংশ ডিএ যুক্ত থাকবে বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে এই ২০ শতাংশকে পুরনো বকেয়া ডিএ হিসেবে গণ্য করা যাবে না বলেও স্পষ্ট করেছেন তিনি।
শিক্ষক দিবসের মঞ্চ থেকে পাঠ্যক্রমে পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, অতীতে রাজ্যের ইতিহাসের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যথাযথভাবে পড়ানো হয়নি। এবার নতুন প্রজন্মের মধ্যে দেশপ্রেম এবং রাজ্যের প্রকৃত ইতিহাসের ধারণা তৈরি করতে সিলেবাসে পরিবর্তন আনা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ শুধু পরিকাঠামো বা শিক্ষক নিয়োগ নয়, স্কুলের পাঠ্যক্রমেও আমূল পরিবর্তনের পথে হাঁটার পরিকল্পনা করছে রাজ্য সরকার।
স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রশাসনিক কাজের চাপ কমানোর বিষয়টিও উঠে আসে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে। তাঁর মতে, শিক্ষকদের মূল দায়িত্ব পড়ানো। মিড-ডে মিলের হিসাব বা অন্যান্য প্রশাসনিক কাজে তাঁদের অতিরিক্ত সময় ব্যয় করা উচিত নয়। সেই কারণে প্রয়োজনীয় শিক্ষাকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষার বিষয়টিও। তাঁর অভিযোগ, পূর্বতন সরকারের আমলে অস্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার কারণে শিক্ষক সমাজের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। এবার আইনি নির্দেশিকা মেনেই স্বচ্ছতার সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
স্কুলশিক্ষার পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও পড়ুয়াদের জন্য সরকারি সহায়তা অব্যাহত রাখার বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। স্বামী বিবেকানন্দ মেরিট স্কলারশিপ চালু রাখার কথাও জানিয়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে বকেয়া ডিএ, পাঠ্যক্রম, স্কুলের পরিকাঠামো এবং মডেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান– শিক্ষাক্ষেত্রে একাধিক পরিবর্তনের রূপরেখা তুলে ধরলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সরকারের লক্ষ্য, ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ধাপে ধাপে রাজ্যের স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ এবং মানসম্মত করে তোলা।








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন