সমকালীন প্রতিবেদন : নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ২০২৬ সালের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে সদস্য দেশগুলির সর্বসম্মত যৌথ ঘোষণাপত্রে জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাওয়ে ঘটে যাওয়া নৃশংস জঙ্গি হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করার কড়া ও স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে। পরপর দ্বিতীয় বছর ব্রিকসের মঞ্চে পহেলগাও হামলার বিষয়টি উঠে এলেও, গত বছরের মন্ত্রী পর্যায়ের যৌথ বিবৃতির পর এবারই প্রথম রাষ্ট্রনেতাদের সশরীরে উপস্থিতিতে প্রধান যৌথ ঘোষণাপত্রে সরাসরি এই বিষয়টিকে স্থান দেওয়া হলো।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, চিনের মতো পাকিস্তান-ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্রনেতাদের সরাসরি উপস্থিতিতে এই ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ায় বিশ্বমঞ্চে ইসলামাবাদ নজিরবিহীন কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়ল। দিল্লি ঘোষণাপত্রে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, কোনো উদ্দেশ্যে, কোনো প্রেক্ষাপটে বা যে কোনো ব্যক্তি ও সংগঠনের মাধ্যমেই পরিচালিত হোক না কেন, কোনো রূপেই সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন বা অজুহাত দিয়ে ঢাকা দেওয়া সম্ভব নয়। সীমান্ত পেরিয়ে ছায়াযুদ্ধ ও অনুপ্রবেশ ঘটানো, সন্ত্রাসী কার্যকলাপে আর্থিক মদত দেওয়া এবং জঙ্গিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল জোগানো সম্পূর্ণ বন্ধ করাই এখন ব্রিকস রাষ্ট্রগুলির অন্যতম প্রাথমিক লক্ষ্য।
একই সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় বহুদিনের ‘দ্বৈত মানদণ্ড’ বা দ্বিমুখী নীতিকে সম্পূর্ণ খারিজ করেছেন ব্রিকস নেতারা। অর্থাৎ কোনো একটি সন্ত্রাসী ঘটনাকে এক ক্ষেত্রে গুরুতর অপরাধ এবং অন্য ক্ষেত্রে ভূ-রাজনৈতিক সুবিধার্থে হালকা হিসেবে দেখার মানসিকতা আর সহ্য করা হবে না। রাষ্ট্রনেতারা স্পষ্ট করেছেন, আন্তর্জাতিক আইন মেনে সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত বা মদতদাতা প্রতিটি ব্যক্তি ও সংগঠনকে সমভাবে আদালতের মুখোমুখি করতে হবে।
এই যৌথ ঘোষণার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো বেজিং এবং তেহরানের রাজকীয় অবস্থান বদল। ২২ এপ্রিল পহেলগাঁওয়ে লস্কর-ই-তৈবার ছায়া সংগঠন টিআরএফ-এর হামলায় ২৬ জন নিরপরাধ সাধারণ মানুষ প্রাণ জানান। এর জবাবে ভারত গত ৭ মে ভোররাতে ‘অপারেশন সিঁদুর’ চালিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে পাকিস্তান ও পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের নয়টি প্রধান জঙ্গিঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেয়।
পরবর্তী সীমান্ত সংঘাতের সময় আন্তর্জাতিক জলঘোলা করে চিন ও ইরান পরোক্ষভাবে ইসলামাবাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও, দিল্লির বিশ্বমঞ্চে তারা ভারত সরকারের স্পষ্ট ও কঠোর অবস্থানের সামনে নিজেদের সুর বদলাতে বাধ্য হয়। ভারতের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলেই আজ পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের মিত্র চিন ও ইরান যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে পহেলগাও হামলার নিন্দা এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে সই করেছে।
পাশাপাশি, বর্তমান বিশ্বে তরুণ প্রজন্মের একাংশের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া উগ্রবাদ ও চরমপন্থী চিন্তাভাবনা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে এই সম্মেলনে। সন্ত্রাসবাদ দমনে সদস্য দেশগুলোর ‘কাউন্টার-টেররিজম ওয়ার্কিং গ্রুপ’-এর কাজের ভূয়সী প্রশংসা করার পাশাপাশি আগামী দিনে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। অপারেশন সিঁদুরের মাধ্যমে ভারতীয় সামরিক বাহিনী যে সামরিক শক্তিমত্তা প্রদর্শন করেছিল, ব্রিকস সম্মেলনে দিল্লি ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে ভারত তা দিয়ে এক ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সাফল্য নিশ্চিত করল।








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন