সমকালীন প্রতিবেদন : তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় প্রতীক ‘ঘাসের উপর জোড়াফুল’ নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবিরের মধ্যে চলা টানাপোড়েন এবার পৌঁছেছে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে। নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনের আগে প্রতীক নিয়ে অন্তর্বর্তী কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারে নির্বাচন কমিশন। কমিশন সূত্রে খবর, সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে আপাতত ‘জোড়াফুল’ প্রতীকটি ফ্রিজ করে দেওয়ার সম্ভাবনার উপর। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি।
দলের নাম ও প্রতীকের দাবিদার কে, তা নির্ধারণের আগে শনিবার দুই পক্ষকেই নিজেদের বক্তব্য ও নথি পেশ করার জন্য তলব করেছিল নির্বাচন কমিশন। প্রথমে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবিরের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক হয়। পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধি দল কমিশনের দ্বারকা এলাকার দফতরে গিয়ে নিজেদের দাবি তুলে ধরে। এরপর কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করে কমিশন।
বৈঠক শেষে কালীঘাটপন্থী শিবিরের অন্যতম মুখ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, প্রায় দু’ঘণ্টা ধরে কমিশনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। কমিশনের পক্ষ থেকে যে সমস্ত প্রশ্ন করা হয়েছিল, তার উত্তর তাঁরা দিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। তবে বৈঠকের পরই কমিশনের সম্ভাব্য অন্তর্বর্তী নির্দেশ নিয়ে আশঙ্কার কথা জানান কল্যাণ। তাঁর বক্তব্য, কমিশন হয়তো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে কোনও অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিতে পারে। এমন নির্দেশ জারি হলে তার বিরুদ্ধে আইনি পথে যাওয়ার প্রস্তুতিও কালীঘাট শিবিরের রয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরও নিজেদের দাবিতে অনড়। বৈঠক শেষে তাঁদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তাঁরাই প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধিত্ব করছেন এবং ‘জোড়াফুল’ প্রতীকের উপর তাঁদেরই অধিকার থাকা উচিত। দলের মালিকানা নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ঋতব্রত শিবিরের তরফে বলা হয়, “তৃণমূল কারও বাবার দল নয়।”
নির্বাচন কমিশনের শুনানি ঘিরে দুই শিবিরের রাজনৈতিক চাপানউতোরও প্রকাশ্যে এসেছে। কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের পর ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করেন। তৃণমূল সরকারের আমলে রাজ্যের আইনজীবী হিসেবে কল্যাণ কত টাকা নিয়েছেন, তা মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লিখে জানতে চাইবেন বলেও জানান তিনি।
তার পাল্টা জবাব দেন কল্যাণ। তাঁর দাবি, আইনজীবী হিসেবে মামলা লড়ে পারিশ্রমিক নেওয়া তাঁর পেশাগত অধিকার এবং সেই আয়ের জন্য তিনি করও দিয়েছেন। একই সঙ্গে ঋতব্রত আগে অন্য রাজনৈতিক দল থেকে এসে তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছিলেন কেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। উপনির্বাচন নিয়েও অবস্থান স্পষ্ট করেছেন কল্যাণ। তাঁর দাবি, নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর— দুই কেন্দ্রেই তৃণমূল প্রার্থী দেবে।
দলীয় প্রতীক নিয়ে কমিশনের সিদ্ধান্ত কী হতে পারে, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে চারটি সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
প্রথম সম্ভাবনা, ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ও ‘ঘাসের উপর জোড়াফুল’ প্রতীক কালীঘাটপন্থী শিবিরের হাতে দেওয়া হতে পারে। সে ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবিরই আগামী উপনির্বাচন-সহ পরবর্তী নির্বাচনে জোড়াফুল প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে।
দ্বিতীয় সম্ভাবনা, কমিশন যদি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরকে প্রতীক দিয়ে দেয়, তাহলে মমতা-অনুগামীদের নতুন প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে নামতে হবে। সূত্রের দাবি, এমন পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে কালীঘাট শিবির বিকল্প প্রতীক নিয়েও চিন্তাভাবনা করে রেখেছে। অবশ্য যে পক্ষই প্রতীক হারাবে, তারা আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে।
তৃতীয় সম্ভাবনা, কমিশন এখনই কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিয়ে ‘স্থিতাবস্থা’ বজায় রাখার নির্দেশ দিতে পারে। একই সঙ্গে দুই পক্ষকেই আরও নথি ও তথ্য জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে আপাতত জোড়াফুল প্রতীক ব্যবহার করে উপনির্বাচনে লড়ার সুযোগ মমতা শিবিরের কাছেই থাকবে।
চতুর্থ এবং সবচেয়ে আলোচিত সম্ভাবনা, অন্তর্বর্তী নির্দেশে ‘ঘাসের উপর জোড়াফুল’ প্রতীকটি ফ্রিজ করে দেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ, শুনানি চলাকালীন কোনও পক্ষই প্রতীকটি ব্যবহার করতে পারবে না। সেক্ষেত্রে দুই শিবিরকেই বিকল্প প্রতীক বা অন্য কোনও সাংগঠনিক পরিচয়ে নির্বাচনে লড়তে হতে পারে। এরপর দীর্ঘ শুনানি ও নথিপত্র পর্যালোচনার মাধ্যমে কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কমিশনের সিদ্ধান্ত। কারণ, প্রতীক সংক্রান্ত চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হলে প্রার্থী মনোনয়ন থেকে প্রচার– সর্বত্রই তার প্রভাব পড়তে পারে। কালীঘাটপন্থী তৃণমূল নেতাদের বক্তব্য, কমিশন অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিলেও তাঁরা আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন। অন্যদিকে ঋতব্রত শিবিরও জোড়াফুল প্রতীকের দাবিতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। ফলে আপাতত সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই— ‘ঘাসের উপর জোড়াফুল’ শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকবে?









কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন