সমকালীন প্রতিবেদন : ২০১৪ সালের স্মৃতি এখনও ফুটবলপ্রেমীদের মনে অমলিন, যেখানে ফাইনালে জার্মানির কাছে পরাজিত হয়েও টুর্নামেন্টের সেরা ফুটবলার হিসেবে গোল্ডেন বল (সোনার বল) মাথায় তুলেছিলেন লিওনেল মেসি। তবে ফুটবল ঈশ্বরের চিত্রনাট্য এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপ নিল আমেরিকার মাটিতে। মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের এই মহা-লড়াইয়ে এবার পুরোপুরি খালি হাতেই ফিরতে হলো বিশ্বজয়ী এই মহানায়ককে। ব্যক্তিগত কোনো অর্জনের আলো এবার তাঁর গায়ে লাগেনি। উল্টোদিকে, বিশ্ব ফুটবলের এই মেগা টুর্নামেন্টে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করল ইউরোপের পরাশক্তি স্পেন। প্রতিযোগিতার মোট চারটি প্রধান ব্যক্তিগত পুরস্কারের মধ্যে তিনটিই গিয়েছে স্প্যানিশ শিবিরের ঝুলিতে, আর বাকি একটি লাভ করেছে ফ্রান্স।
ফাইনালে মাঠে নামার আগেই টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার ‘সোনার বুট’ বা গোল্ডেন বুট নিজের নামে প্রায় নিশ্চিত করে ফেলেছিলেন ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপে। আসরে অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স প্রদর্শন করে মোট ১০টি গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ৪টি গোল। গোলদাতার তালিকায় তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসি করেছেন ৮টি গোল এবং সমসংখ্যক ৪টি অ্যাসিস্ট। ফলে এমবাপের হাতে এই ট্রফি ওঠা ছিল শুধুই সময়ের অপেক্ষা।
সাধারণত রক্ষণাত্মক বা আক্রমণভাগের ফুটবলারদের ভিড়ে মিডফিল্ডারদের হাতে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার খুব একটা দেখা যায় না। তবে এবার সেই চেনা সমীকরণ বদলে দিয়েছেন স্পেনের অধিনায়ক রদ্রি। গোটা প্রতিযোগিতায় স্প্যানিশ দলের তালের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করেছেন এই মিডফিল্ডার। শুধু তাই নয়, টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সফল পাস দেওয়ার অনন্য রেকর্ড গড়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, স্পেনের দুর্গ রক্ষায় অনন্য নজির গড়েছেন গোলরক্ষক উনাই সিমন। পুরো টুর্নামেন্টে প্রতিপক্ষের কোনো ফুটবলার তাঁকে পরাস্ত করতে পারেননি, হজম করেছেন মাত্র একটি গোল। ফলে তাঁর সোনার গ্লাভস জয় ছিল অনস্বীকার্য। একই সাথে স্পেনের রক্ষণভাগের ১৯ বছর বয়সী তরুণ তুর্কি পাউ কুবারসি তাঁর পরিণত মানসিকতা ও নিখুঁত পাসিংয়ের জন্য আসরের সেরা উদীয়মান তারকার খেতাব অর্জন করেছেন।
বিশ্ব ফুটবলের এই আসরে আরও এক স্প্যানিশ তরুণ লামিনে ইয়ামালকে নিয়ে উন্মাদনা ছিল চরমে। ১৯ বছর বয়সী এই বিস্ময় বালকের বিশ্বজয়ের নেপথ্যে রয়েছে তাঁর বাবা-মায়ের চরম আত্মত্যাগ। চরম দারিদ্র্যের মাঝে মরক্কো বংশোদ্ভূত বাবা মুনির নাসরাউই এবং গিনি থেকে আসা মা শিলা এবানার প্রথম সন্তান হিসেবে জন্ম নেন ইয়ামাল (পুরো নাম: লামিনে ইয়ামাল নাসরাউই এবানা)। নামের প্রথমাংশ ‘লামিনে’ এসেছে আরবি ‘আল-আমিন’ (সৎ/বিশ্বস্ত) থেকে এবং ‘ইয়ামাল’ এসেছে ‘জামাল’ (সৌন্দর্য) থেকে। জন্মের সময় আর্থিক সংকটে থাকা এই দম্পতিকে সে সময় সাহায্য করেছিলেন তাঁদের দুই বিশ্বস্ত বন্ধু লামিনে ও ইয়ামাল। তাঁদের কৃতজ্ঞতা জানাতেই সন্তানের এই নামকরণ।
শৈশবেই বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটলেও দিনমজুর বাবা মুনির ছেলের ফুটবলের স্বপ্নকে মরতে দেননি। এমনকি ধার করে জুতোর দোকান থেকে বুট এনে দিয়েছিলেন ছেলের জন্য। আজ সেই ইয়ামাল বিশ্বখ্যাত লা মাসিয়া অ্যাকাডেমি পার হয়ে কোটি হৃদয়ের স্পন্দন, অথচ তাঁর বাবা শারীরিক অসুস্থতার কারণে আমেরিকার এই সফরে ছেলের পাশে থাকতে পারেননি। কিন্তু ইয়ামাল তাঁর শিকড় ভোলেননি। আজও গোলের পর আঙুল দিয়ে তিনি প্রদর্শন করেন '৩০৪' সংখ্যাটি, যা তাঁর শৈশবের দরিদ্র অভিবাসী কলোনি রোকাফন্ডার পোস্টকোড।
শিরোপাধারী আর্জেন্টিনা ফাইনালে স্পেনের আক্রমণাত্মক ফুটবলের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি। লিওনেল স্কালোনির রক্ষণাত্মক রণকৌশল এবং মাঠের পারফরম্যান্স নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন। আলবিসেলেস্তেদের এই শোচনীয় পরাজয়ের প্রধান যে কারণগুলি রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেজ্ঞরা, সেগুলি হল– পূর্ববর্তী ম্যাচগুলিতে মেসি দলকে একক দক্ষতায় টেনে তুললেও ফাইনালে স্পেনের কড়া মার্কিংয়ে তিনি সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ছিলেন। মেসি আটকে যেতেই আর্জেন্টিনার পুরো আক্রমণভাগ দিক হারিয়ে ফেলে। স্পেনের টিকিটাকা ও গতিময় মাঝমাঠের কাছে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ড পরাস্ত হয়। ম্যাচের সিংহভাগ সময় বলের দখল স্পেনের পায়ে ছিল, আর্জেন্টাইন ফুটবলাররা কেবল বলের পেছনে ছুটেছেন।
ম্যাচের এক জটিল মুহূর্তে এঞ্জো ফের্নান্দেজ লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে আর্জেন্টিনা ১০ জনের দলে পরিণত হয়। ১০ জন নিয়ে এই ক্ষিপ্র স্পেনের বিরুদ্ধে লড়াই করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। প্রথমার্ধেই নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো হ্যামস্ট্রিং চোটের কারণে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন। রক্ষণভাগের এই মূল স্তম্ভ চলে যাওয়ায় দলের ডিফেন্স সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই কোচ স্কালোনির অতি-রক্ষণাত্মক ও খেলার গতি ধীর করার কৌশলের সমালোচনা হচ্ছিল। ফাইনালেও আক্রমণাত্মক ফুটবলের বদলে ডিফেন্স করার চরম মাশুল দিতে হলো আর্জেন্টাল দলকে।









কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন