সমকালীন প্রতিবেদন : রাজ্যে প্রথমবার প্রয়োগ হতে চলেছে 'গুন্ডাদমন আইন'। নিট পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে শুক্রবার কলকাতার রাজপথে যৌথ মহামিছিলের ডাক দিয়েছিল একাধিক বামপন্থী ছাত্র সংগঠন। ওই কর্মসূচিতে অংশ নেয় 'ককরোচ জনতা পার্টি'-সহ বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ মানুষ। প্রথমে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে শুরু হওয়া মিছিল ধর্মতলায় পৌঁছানোর পরই পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। অভিযোগ, আন্দোলনকারীদের একাংশ হঠাৎই কর্তব্যরত পুলিশ কর্মী এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়। মুহূর্তের মধ্যেই গোটা এলাকা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং সংঘর্ষের আবহ তৈরি হয়।
ঘটনার পরপরই আহত সাংবাদিকদের সঙ্গে দেখা করেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁদের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেওয়ার পাশাপাশি দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপের আশ্বাস দেন তিনি। এরপর শনিবার বিধানসভার অধিবেশনে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত বিবৃতি দেন মুখ্যমন্ত্রী। সাংবাদিকদের উপর হামলার ঘটনাকে তিনি গণতন্ত্র ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার উপর আঘাত বলে উল্লেখ করেন এবং স্পষ্ট ভাষায় জানান, এই ঘটনায় জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। একইসঙ্গে তিনি ঘোষণা করেন, সম্প্রতি বিধানসভায় পাশ হওয়া 'গুন্ডাদমন আইন' এই ঘটনাতেই প্রথমবার কার্যকর করা হচ্ছে।
বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, আন্দোলনের আগে থেকেই পুলিশকে সংযম বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তাঁর কথায়, যতক্ষণ পর্যন্ত পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যাচ্ছে, ততক্ষণ কোনোভাবেই লাঠিচার্জ বা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ না করার নির্দেশ ছিল। পুলিশ সেই নির্দেশ মেনেই ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, এই ভিড়ের মধ্যে বিভিন্ন এলাকা থেকে পরিকল্পিতভাবে বহিরাগতদের আনা হয়েছিল। তাঁর দাবি, খিদিরপুর, মেটিয়াবুরুজ, রাজারহাট, বেলগাছিয়া এবং বাগুইআটির মতো এলাকা থেকে লোক জড়ো করে পরিস্থিতি অশান্ত করার চেষ্টা করা হয়। তিনি আরও বলেন, আন্দোলনের নামে মূল উদ্দেশ্য ছিল পুলিশকে প্ররোচিত করে লাঠিচার্জে বাধ্য করা, যাতে বড় ধরনের সংঘর্ষের পরিবেশ তৈরি হয়। কিন্তু পুলিশ সেই প্ররোচনায় পা দেয়নি এবং সংযমের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে।
আহত সাংবাদিকদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই মোট সাতটি পৃথক মামলা দায়ের হয়েছে। তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ, সংবাদমাধ্যমের ভিডিও এবং বিভিন্ন আলোকচিত্র খতিয়ে দেখে অন্তত ৭০ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে বিধানসভায় জানান মুখ্যমন্ত্রী। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দাবি করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, চিহ্নিত ৭০ জনের মধ্যে একজনও প্রকৃত ছাত্র বা নিট আন্দোলনের অংশগ্রহণকারী নন। এমনকি যাঁরা নিজেদের 'ককরোচ পার্টি'-র সদস্য বলে পরিচয় দিচ্ছেন, তাঁদের সঙ্গেও এই ব্যক্তিদের কোনো সম্পর্ক নেই বলে তাঁর দাবি। বরং এরা সকলেই বহিরাগত দুষ্কৃতী, যাদের উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলনের আড়ালে অরাজকতা সৃষ্টি করা।
বিধানসভায় দাঁড়িয়ে পাঁচজন মূল অভিযুক্তের নামও প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সদ্য পাশ হওয়া 'গুন্ডাদমন আইন'-এর অধীনে এমন দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যা ভবিষ্যতের জন্য নজির হয়ে থাকবে। তাঁর বক্তব্য, সমাজে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সংগঠিত দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যেই এই আইন আনা হয়েছে।
উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সম্প্রতি পাশ হওয়া 'গুন্ডাদমন আইন' এই প্রথমবার কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ায় প্রয়োগ করা হচ্ছে। রাজ্য সরকারের দাবি, আইনটির মাধ্যমে সংগঠিত অপরাধ, হামলা, ভাঙচুর এবং অরাজকতামূলক কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়ে দিয়েছেন, যারা আন্দোলনের আড়ালে হিংসা ও বিশৃঙ্খলা ছড়ানোর চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতেও এই আইনের পূর্ণ প্রয়োগ করা হবে।








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন