সমকালীন প্রতিবেদন : নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারি এবং তার জেরে দেশজুড়ে আছড়ে পড়া নজিরবিহীন ছাত্র আন্দোলনের তীব্র প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে অবশেষে নতিস্বীকার করলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। দীর্ঘ জল্পনা ও বিরোধীদের ধারাবাহিক দাবির অবসান ঘটিয়ে শনিবার দুপুরেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে নিজের পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীও ইতিমধ্যে তাঁর এই ইস্তফাপত্র গ্রহণ করেছেন।
দিল্লির যন্তর মন্তরে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র নেতৃত্বে গড়ে ওঠা উত্তাল আন্দোলন যখন বিহারের রাজধানী পটনা-সহ দেশের অন্যান্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছিল, ঠিক তখনই ইস্তফা দিলেন শিক্ষামন্ত্রী। ঘটনাচক্রে, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের তৃতীয় দফার নির্ধারিত বৈঠকের ঠিক আগেই এল এই পদত্যাগের ঘোষণা। ইস্তফা দেওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'এক্স'-এ (টুইটার) একটি পোস্টের মাধ্যমে এবং 'তরুণ বন্ধুদের' উদ্দেশ্যে লেখা দু'পাতার একটি আবেগঘন খোলা চিঠিতে নিজের এই চরম সিদ্ধান্তের বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন ধর্মেন্দ্র প্রধান।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের লেখা সেই চিঠির ছত্রে ছত্রে ধরা পড়েছে গত কয়েক দিনের ঘটনাক্রম নিয়ে তাঁর গভীর বেদনা ও ক্ষোভ। শিক্ষামন্ত্রী লিখেছেন, “গত ১০ দিনের ঘটনাক্রম দেখে আমার মন অত্যন্ত ব্যথিত। ভারতের যুবশক্তিই এই দেশের আসল শক্তি এবং আমি তাঁদের যুক্তিযুক্ত প্রত্যাশাগুলিকে সম্মান করি। এটি আমার ব্যক্তিগত সম্মানের বা প্রতিপত্তির বিষয় নয়। দেশের যুবসমাজকে আমি কোনো বিভ্রান্তির চক্রব্যূহে জড়িয়ে পড়তে দেব না, এটাই আমার মূল সংকল্প।”
খোলা চিঠিতে প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী অভিযোগ করেন, আন্দোলনকে হাতিয়ার করে কোনো রাষ্ট্রবিরোধী বা দেশবিরোধী শক্তি যাতে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে যুবসমাজকে বিপথে চালিত করতে না পারে এবং দেশের ঐক্য বিনষ্ট না করতে পারে, সে বিষয়ে তিনি সতর্ক ছিলেন। পাশাপাশি, আন্দোলনরত পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ যাতে দীর্ঘমেয়াদী আইনি জটিলতায় আটকে না গিয়ে তাঁরা আবার পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারেন, এই সমস্ত দিক বিবেচনা করেই তিনি মন্ত্রিসভা থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
প্রতিবেদনে জানা গেছে, যন্তর মন্তরে আন্দোলনরত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র মূল দাবিই ছিল শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ। এর পাশাপাশি, নিট কেলেঙ্কারির কারণে যে সমস্ত পড়ুয়া মানসিক অবসাদে আত্মঘাতী হয়েছেন, তাঁদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং আন্দোলনকারী ছাত্রদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনি পদক্ষেপ না করার দাবিও তোলা হয়েছিল। কেন্দ্র ইতিপূর্বে আন্দোলনকারীদের বেশ কিছু দাবি মেনে নিয়েছিল এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ভিডিও বার্তার মাধ্যমে এবং দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং অনশনকারী সোনম ওয়াংচুককে হাসপাতালে দেখতে গিয়ে আশ্বস্ত করেছিলেন। এমনকি সরকারের তরফে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়টি বিবেচনা করে দেখা হবে। শেষ পর্যন্ত শনিবার তৃতীয় বৈঠকের আগের মুহূর্তেই ইস্তফা দিলেন ধর্মেন্দ্র।
পদত্যাগপত্রের সাথে যুক্ত বিবৃতিতে সদ্যপ্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী গত ৩ মে অনুষ্ঠিত নিট-ইউজি পরীক্ষার অনিয়ম মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া কড়া পদক্ষেপের একটি খতিয়ান পেশ করেন। তিনি জানান, অনিয়ম প্রকাশ্যে আসার পরপরই ঘটনার নৈতিক দায় নিজের কাঁধে নিয়ে তদন্তের দায়িত্ব সিবিআই-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়। বাতিল হওয়া পরীক্ষা পর্যালোচনার পর গত ২১ জুন পুনরায় অত্যন্ত সফলভাবে তা গ্রহণ করা হয়েছে।
গত ১৬ জুলাই পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে, যা অত্যন্ত সন্তোষজনক এবং এতে দেশের বহু দরিদ্র পরিবারের মেধাবী পরীক্ষার্থী নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন। পরীক্ষা ব্যবস্থায় শতভাগ স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনতে আগামী বছর থেকে নিট পরীক্ষা সম্পূর্ণ কম্পিউটার ভিত্তিক মাধ্যমে আয়োজন করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পরীক্ষা মাফিয়াদের ষড়যন্ত্রে যাতে কোনো মেধাবী ছাত্রের স্বপ্ন নষ্ট না হয় তা সুনিশ্চিত করতে তিনি দিনরাত কাজ করেছেন। তবে এই সংকটময় সময়ে দায়িত্বশীল পদে বসে থাকা কিছু ব্যক্তি শিক্ষার্থীদের উস্কানি দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন।
বিগত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষা সংস্কার ও শিক্ষক সমাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা স্মরণ করে ধর্মেন্দ্র প্রধান জানান, একটি শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থাই হলো উন্নত ভারতের ভিত্তিশিলা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দূরদর্শী নেতৃত্বে দেশসেবা করার সুযোগ পাওয়ার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। পরিশেষে, ভগবান শ্রীজগন্নাথ দেবের আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে ভবিষ্যতেও ভারতমাতা এবং ওড়িশার জনগণের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখার অঙ্গীকার জানিয়ে শিক্ষা মন্ত্রকের সমস্ত সহকর্মী ও আধিকারিকদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি।









কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন