Breaking

Post Top Ad

Your Ad Spot

শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬

সুটিয়া ধর্ষণকাণ্ডের প্রতিবাদী বরুণ বিশ্বাস খুনের পুনর্তদন্তের আশ্বাস দিলেন মুখ্যমন্ত্রী

Murder-case-of-Barun-Biswas

সমকালীন প্রতিবেদন : দীর্ঘ দেড় দশক বা প্রায় ১৪ বছর পর অবশেষে কি রূপান্তরের পথে সুটিয়ার লড়াকু শিক্ষক বরুণ বিশ্বাস হত্যাকাণ্ডের তদন্ত? শনিবার সল্টলেকে বিজেপির রাজ্য কার্যালয়ে আয়োজিত নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ‘জনতার দরবার’ কর্মসূচিতে বরুণ বিশ্বাসের পরিবারের উপস্থিতি এবং মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠনের আশ্বাস সেই জল্পনাই উস্কে দিল। ২০১২ সালের ৫ জুলাই উত্তর ২৪ পরগনার গোবরডাঙা স্টেশনের কাছে দুষ্কৃতীদের গুলিতে নৃশংসভাবে খুন হন কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশনের (মেন) বাংলার শিক্ষক তথা সমাজকর্মী বরুণ বিশ্বাস। 

সুটিয়া অঞ্চলে সংঘটিত ধারাবাহিক নারী নির্যাতন ও গণধর্ষণের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করা বরুণকে কেন এবং কার নির্দেশে খুন হতে হয়েছিল, তা নিয়ে গত ১৪ বছর ধরে কেবলই ধামাচাপা দেওয়ার রাজনীতি চলেছে বলে অভিযোগ। অবশেষে শনিবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে মুখোমুখি সাক্ষাতের পর দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত এই হত্যাকাণ্ডের বিচার পাওয়ার আশায় নতুন করে বুক বাঁধছে নিহত শিক্ষকের পরিবার।

শনিবার ‘জনতার দরবার’-এ মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বরুণ বিশ্বাসের দাদা অসিত বিশ্বাস এবং দিদি প্রমিলা রায় বিশ্বাস। সাক্ষাৎকারে তাঁরা গত সরকারের আমলের চরম প্রশাসনিক উদাসীনতা, গাফিলতি ও হুমকির খতিয়ান তুলে ধরেন। মুখ্যমন্ত্রীর হাতে একটি লিখিত আবেদনপত্র ও গত ১৩ জুন বনগাঁ পুলিশ জেলার সুপারের কাছে দেওয়া অভিযোগের প্রতিলিপি তুলে দিয়ে তাঁরা সরাসরি অভিযোগ করেন, এই হত্যাকাণ্ডের মূল চক্রী ছিলেন হাবড়ার তৎকালীন তৃণমূল বিধায়ক তথা প্রাক্তন মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় (বালু) মল্লিক। 

পরিবারের দাবি, জ্যোতিপ্রিয়-ঘনিষ্ঠ অপরাধীদের তোলাবাজির সিন্ডিকেট, চাষের জমি দখল, বেআইনি ইটভাটা তৈরি এবং সেচের জন্য বরাদ্দ কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলেছিলেন বরুণ। আর সেই কারণেই তৎকালীন মন্ত্রীর অঙ্গুলিহেলনে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সুটিয়ার প্রতিবাদের মুখ বরুণকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ক্ষোভ উগরে দেন বরুণের দাদা ও দিদি। 

অসিত বিশ্বাস অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ তুলে বলেন, “গত ১৪ বছরে সিআইডি সঠিক তদন্ত তো করেইনি, উল্টে মামলার বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করে দিয়েছে। মূল অভিযুক্তদের আড়াল করতে ২০১২ সালের ২৫ জুলাই ভবানী ভবনে ডেকে তদানীন্তন পুলিশ আধিকারিকরা আমাদের কিছু ভুয়ো কল ডিটেলস্ দেখিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, দমদম সেন্ট্রাল জেলে বন্দি গাইঘাটার দুষ্কৃতী সুশান্ত চৌধুরীই এককভাবে ভাইকে খুন করেছে। আমরা যখন জানতে চাই সুশান্ত কার নির্দেশে এই কাজ করেছে এবং এর নেপথ্যে কোন প্রভাবশালী রাজনৈতিক মাথা রয়েছে, তখন ওই পুলিশ আধিকারিক উল্টে আমাদেরই হুমকি ও থ্রেট দেন।”

পরিবারের আরও অভিযোগ, শুধু পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্তারাই নন, গত ১৪ বছর ধরে তৃণমূল নেতা এবং স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তাঁদের ওপর লাগাতার মানসিক চাপ ও হুমকি দেওয়া হয়েছে। এমনকি বিশ্বাস পরিবারের পক্ষে লড়া আইনজীবীকেও নানাভাবে কোণঠাসা ও চরম চাপে রাখা হয়েছিল, যাতে তিনি আদালতে ঠিকমতো ওকালতি করতে না পারেন। দিদি প্রমীলা রায় অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “আমার ভাই শেষ মুহূর্তে ছটফট করতে করতে একটু জল চেয়েছিল, সেই জলটুকুও দেওয়া হয়নি ওকে। এতটাই নির্মম ও পৈশাচিক ছিল ওরা। অথচ খুনের পর থেকে বছরের পর বছর ধরে অপরাধীরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেরিয়েছে আর আমরা, নির্যাতিত পরিবার হয়েও চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছি।”

তবে শনিবারের ‘জনতার দরবার’ বরুণের পরিবারকে দীর্ঘ হতাশা থেকে আলোর পথ দেখিয়েছে। প্রমীলা দেবী জানান, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে যথেষ্ট সময় নিয়ে তাঁদের সমস্ত অভিযোগ ধৈর্য ধরে শুনেছেন। সিআইডি তদন্তের গাফিলতির বিষয়গুলি মুখ্যমন্ত্রীও কার্যত মেনে নিয়েছেন বলে দাবি করেন অসিত বিশ্বাস। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের আশ্বস্ত করেছেন যে বরুণ বিশ্বাস হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী তদন্তের সুবিধার্থে সমস্ত পুরনো নথিপত্র ও তথ্যপ্রমাণ দিয়ে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানিয়েছেন বরুণের পরিবারকে। 

সুটিয়ার বুকে নারীদের সম্ভ্রম রক্ষা করতে গিয়ে যে যুবকের প্রাণ অকালে ঝরে গিয়েছিল, প্রায় দেড় দশক ধরে তাঁর পরিবার কেবলই বিচারের জন্য এক দরজা থেকে অন্য দরজায় কড়া নেড়েছে। নতুন সরকারের আমলে মুখ্যমন্ত্রীর এই প্রত্যক্ষ আশ্বাসের পর রাজনৈতিক মহলের ধারণা, এবার সুটিয়া কাণ্ডের নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালীদের মুখোশ খোলার প্রক্রিয়া দ্রুত গতি পাবে। বরুণের পরিবারের এখন একটাই দাবি– প্রকৃত দোষী ও মূলচক্রীরা যেন আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি পায়।‌



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন