সমকালীন প্রতিবেদন : হাইকোর্টের কড়া নির্দেশ এবং রাজ্য সরকারের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা– কোনো কিছুকেই তোয়াক্কা করছেন না একশ্রেণীর স্কুল শিক্ষক। সরকারি নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একাধিক স্কুলের শিক্ষকেরা এখনো রমরমিয়ে গৃহশিক্ষকতা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অথচ, নিয়ম রক্ষার্থে জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শকের অফিসে তাঁরা প্রত্যেকেই লিখিত মুচলেকা দিয়ে দাবি করেছেন যে, তাঁরা কোনো রকম ব্যক্তিগত টিউশনির সাথে যুক্ত নন। সরকারি শিক্ষকদের এই দ্বিমুখী নীতি ও আইন অমান্যের বিরুদ্ধে নতুন করে আন্দোলনে নেমেছে সর্বভারতীয় গৃহ শিক্ষক সংগঠনের বনগাঁ শাখা।
বৃহস্পতিবার সংগঠনের প্রতিনিধিরা বনগাঁ স্কুল শিক্ষা দপ্তরের আধিকারিকের সঙ্গে দেখা করে একটি স্মারকলিপি জমা দেন এবং নিজেদের দাবি-দাওয়া তুলে ধরেন। আন্দোলনকারী গৃহশিক্ষকদের বক্তব্য, দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের পর আদালত ও সরকার এই বেআইনি প্রথা বন্ধের নির্দেশ দিলেও বাস্তব চিত্রটা বদলায়নি। ভুয়ো মুচলেকা দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন অভিযুক্ত শিক্ষকেরা।
এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে খোলা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে আন্দোলনকারী এক গৃহশিক্ষক বলেন, “একশ্রেণীর অভিভাবক আমাদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। আমরা চ্যালেঞ্জ করছি, সরকারি শিক্ষকেরা চাকরি ছেড়ে আমাদের সাথে একই পরীক্ষায় বসুন, প্রমাণ হয়ে যাবে কারা বেশি যোগ্য। আমরা অন্তত পরীক্ষার আগে ছাত্রছাত্রীদের হাতে প্রশ্নপত্র তুলে দিয়ে বেশি নম্বর পাওয়ানোর মতো অনৈতিক কাজ করি না।”
অন্যদিকে, এই আকস্মিক নিষেধাজ্ঞায় চরম বিপাকে পড়েছেন অভিভাবকদের একাংশ। তাঁদের দাবি, শিক্ষাবর্ষের মাঝামাঝি সময়ে এভাবে গৃহশিক্ষকতা বন্ধ করে দিলে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ব্যাপক ক্ষতি হবে। পাশাপাশি, স্কুল শিক্ষক ছাড়া অন্যান্য গৃহশিক্ষকদের সকলের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পড়ানোর মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। গৃহশিক্ষকতার বিষয়টিকে বিবেচনা করার জন্য রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন তাঁরা।
তবে আন্দোলনরত গৃহশিক্ষকদের পাল্টা যুক্তি, শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীরা গৃহশিক্ষকতাকেই নিজেদের সম্মানজনক জীবিকা হিসেবে বেছে নিয়েছেন এবং তাঁদের যোগ্যতা কোনো অংশেই স্কুল শিক্ষকদের চেয়ে কম নয়। তাঁরা চান, শিক্ষকেরা প্রাইভেট টিউশনি বন্ধ করে স্কুলের পড়াশোনায় মন দিন, যাতে ছাত্রছাত্রীদের স্কুলের বাইরে আর কোথাও দৌড়াতে না হয়।
সংগঠনের পক্ষ থেকে মূলত চারটি মূল দাবি জানানো হয়েছে। সেগুলি হল– স্কুল শিক্ষকদের ব্যক্তিগত টিউশনি সম্পূর্ণ বন্ধ করতে অবিলম্বে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ করতে হবে। ডিআই অফিসে জমা পড়া মুচলেকাগুলির সত্যতা যাচাইয়ে যথাযথ তদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে। গৃহশিক্ষকতাকে বৈধ পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বেকারদের সামাজিক সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অভিভাবকদের সচেতন করতে হবে যাতে তাঁরা যোগ্য গৃহশিক্ষকদের কাছেই সন্তানদের পাঠান।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, স্কুল শিক্ষকদের এই টিউশনি সংস্কৃতির কারণে স্কুলের স্বাভাবিক পঠনপাঠন ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষকেরা স্কুলেই তাঁদের পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারছেন না, যার ফলে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে এক ধরণের বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। বনগাঁর এই ঘটনা বর্তমান রাজ্যের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় চ্যালেঞ্জকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। এখন দেখার, আদালতের রায়কে সম্মান জানিয়ে শিক্ষা দপ্তর ভুয়ো মুচলেকা প্রদানকারী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কতটা কড়া ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

.jpeg)







কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন