সমকালীন প্রতিবেদন : পশ্চিমবঙ্গের যোগাযোগ ও পর্যটন পরিকাঠামোয় এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। এবার সরাসরি রেলপথে যুক্ত হতে চলেছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান পুণ্যভূমি গঙ্গাসাগর। শনিবার নবান্নে কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই যুগান্তকারী প্রস্তাব দেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একই সঙ্গে, পূর্বতন সরকারের আমলের সংঘাতের রাজনীতি ভুলে কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয়ের মাধ্যমে রাজ্যে ১ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি রেল প্রকল্পের কাজ শুরু হতে চলেছে বলে জানানো হয়েছে। আগামী ২০২৭ সালের কেন্দ্রীয় সাধারণ বাজেট পেশের আগেই গঙ্গাসাগর রেলপথের কাজ শুরু হয়ে যেতে পারে বলে সূত্রের খবর।
প্রতি বছর গঙ্গাসাগর মেলা তো বটেই, বছরের অন্যান্য সময়েও দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী সাগরদ্বীপে আসেন। তবে এতদিন সরাসরি কোনও রেল যোগাযোগ না থাকায় যাত্রীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হতো। শিয়ালদা দক্ষিণ শাখা থেকে ট্রেনে চেপে কাকদ্বীপ বা নামখানা স্টেশনে নেমে অটো বা টোটো ধরে পৌঁছাতে হতো লট ৮ ঘাটে। সেখান থেকে ভেসেল বা লঞ্চে নদী পার হয়ে কচুবেড়িয়া এবং সেখান থেকে ফের বাসে চেপে পৌঁছানো যেত গঙ্গাসাগরে। সড়কপথের ক্ষেত্রেও ঝক্কি কিছু কম ছিল না। ফলে বয়স্ক ও শিশুদের নিয়ে যাতায়াত করা ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। এবার সরাসরি রেলপথ চালু হলে পুণ্যার্থীদের সেই দুর্ভোগের দিন শেষ হতে চলেছে।
বৈঠকে উপস্থিত কেন্দ্রীয় জাহাজ প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর জানান, "গঙ্গাসাগর পর্যন্ত সরাসরি রেল সংযোগ স্থাপনের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এই প্রকল্পের প্রতি মুখ্যমন্ত্রী বিশেষ আগ্রহ দেখিয়েছেন এবং আগামী দিনে এটি বাস্তবায়নের সমস্ত সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।" এর পাশাপাশি বাগদা থেকে বনগাঁর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রেল প্রকল্প, আন্ডারপাস নির্মাণ নিয়েও বৈঠকে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।
রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের পর কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যের সম্পর্কের যে আমূল পরিবর্তন ঘটেছে, তা এদিনের বৈঠক থেকে স্পষ্ট করে দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নবান্নে রেলমন্ত্রীর উপস্থিতিতে জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্য শোনার পর এক যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, "নতুন সরকারের এক মাসও হয়নি, তার আগেই আমরা কাজ শুরু করে দিয়েছি। আগের সরকারের আমলে কেন্দ্রের সঙ্গে সর্বদা একটা যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব বজায় রাখা হতো, যার ফলে বাংলার মানুষ প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নমূলক প্রকল্প থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। এবার আর তা হবে না। রাজ্যে এবার ১ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগের কাজ হবে।"
তৃণমূল সরকারের আমলের তুলনা টেনে মুখ্যমন্ত্রী বিনিয়োগের খতিয়ান পেশ করে বলেন, ইউপিএ সরকারের আমলে বাংলা যেখানে মাত্র ৪,৩৮০ কোটি টাকা পেয়েছিল, সেখানে মোদী সরকার এক বছরেই বাংলাকে ১৪,২০৫ কোটি টাকা দিয়েছে। রেল প্রকল্পের গতি বাড়াতে রাজ্য সরকার জমিজট কাটানোর বিষয়ে ১০০ শতাংশ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, রেল বোর্ডের চাওয়া অনুযায়ী ৬০টি প্রকল্পের জমি এবং ৪০টি সাবওয়ের জন্য এনওসি দ্রুত দেওয়া হচ্ছে। সুন্দরবন, নন্দীগ্রাম, জঙ্গলমহল, উত্তরবঙ্গ, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, হিলি এবং লালগড়ের মতো যে সমস্ত এলাকা এখনও রেল মানচিত্রের বাইরে রয়েছে, সেখানে জমি দেওয়া হবে এবং রেল বোর্ড ১০০ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ করবে। প্রয়োজনে রাজ্য সরকার জমি অধিগ্রহণ করবে।
রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবও বুলেট ট্রেনসহ বাংলার রেলের আধুনিকীকরণে একাধিক বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যার মধ্যে রয়েছে ১০২টি স্টেশনকে 'অমৃত ভারত স্টেশন' হিসেবে গড়ে তোলা এবং যানজট ও দুর্ঘটনা এড়াতে ৫৩৮টি রেল ওভারব্রিজ ও সাবওয়ে নির্মাণ। পরিশেষে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, "বাংলায় ডাবল ইঞ্জিন সরকার যথাযথ কাজ করছে এবং বাংলার মানুষ এবার এই ডাবল ইঞ্জিনের প্রকৃত স্বাদ পাবেন। রেলের হাত ধরে বাংলার পুনর্নির্মাণ হতে চলেছে।"








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন