Breaking

Post Top Ad

Your Ad Spot

সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬

অবসান কর্পোরেট রাজনীতির অধ্যায়ের: কলকাতা থেকে পাকাপাকিভাবে পাততাড়ি গোটাল আই-প্যাক

 

I-PAC-Packs-Up

সমকালীন প্রতিবেদন : ভোট মেটার আগেই সল্টলেকের অফিসে পড়েছিল তালা। এবার কলকাতা থেকে পাকাপাকিভাবে পাততাড়ি গোটাল ভোটকুশলী সংস্থা আই-প্যাক। এর ফলে বাংলার মাটি থেকে কার্যত মুছে গেল কর্পোরেট রাজনীতির একটি দীর্ঘ ও বিতর্কিত অধ্যায়। নির্বাচনের মাঝপথেই সল্টলেকের অফিসে আচমকা তালা ঝুলিয়ে কর্মীদের ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ বা বাড়ি থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই অফিস আর খোলেনি। উলটে জানা যাচ্ছে, অফিস বন্ধ থাকা অবস্থাতেই কলকাতার বহু কর্মীকে ছাঁটাইয়ের নোটিশ ধরিয়ে দিয়ে জানানো হয়েছে যে সংস্থায় তাঁদের আর প্রয়োজন নেই। বাকি কিছু কর্মীকে দক্ষিণ ভারতে বদলি করে দেওয়া হচ্ছে।

আই-প্যাকের এই ডেরা তোলার আবহেই শাসকদলের অন্দরের ক্ষোভ যেন বারুদ হয়ে ফেটে পড়েছে। বর্ষীয়ান সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সির কাছে ইতিমধ্যেই নিজের পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। চিঠিতে পরাজয়ের ‘নৈতিক দায়’ নেওয়ার কথা বলা হলেও, তাঁর আসল নিশানা যে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ভোটকুশলী সংস্থা আই-প্যাক, তা জলের মতো পরিষ্কার। চিঠিতে নজিরবিহীন আক্রমণ শানিয়ে কাকলি স্পষ্ট লিখেছেন, “ভুঁইফোঁড় সংস্থা দিয়ে কঠিন কাজ হয় না।”

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বাংলায় বিজেপি মাথা তোলার সুযোগ পাওয়ার পরেই ভোটকুশলী প্রশান্ত কিশোরের শরণাপন্ন হয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আই-প্যাকের হাত ধরে তৃণমূল বৈতরণী পার হতেই যেন এক অদ্ভুত মায়ায় পড়ে গিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পিকে বা আই-প্যাককে বিদায় দেওয়া তো দূর, দলের অন্দরেই তাঁদের স্থায়ী জায়গা করে দেওয়া হয়।

মমতা-অভিষেকের পর তৃণমূলে তৃতীয় শক্তি বা ‘থার্ড পাওয়ার সেন্টার’ হয়ে উঠেছিলেন প্রথমে প্রশান্ত কিশোর এবং পরবর্তীতে প্রতীক জৈন। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছায় যে আই-প্যাকের নবীন কর্মীরা জেলা ও ব্লক সভাপতি তো বটেই, খোদ দলের মন্ত্রীদেরও ধমকাতে-চমকাতে শুরু করেছিলেন। 

কালীঘাটের ঘনিষ্ঠ এক প্রবীণ নেতার কথায়, “বাংলায় তৃণমূল সমর্থকদের কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মানেই ছিল একটা আবেগ। তৃণমূল দলটাই চলত সেই আবেগের ওপর ভর করে। আই-প্যাক সেই আবেগকে সরিয়ে দলটাকে যন্ত্র দিয়ে চালাতে চেয়েছিল। ল্যাপটপ ছিল, কিন্তু মাটির খবর ছিল না। যে রাজনৈতিক সমীকরণ মুকুল রায় মানুষের পালস বুঝে ধরতেন, আই-প্যাকের আইআইটি-আইআইএম-এর ছেলেমেয়েরা তা বুঝতে চেয়েছিল ‘মেশিন লার্নিং’ দিয়ে। রাজনীতিটাই আউটসোর্স করে দেওয়া হয়েছিল।”

আই-প্যাকের সঙ্গে তৃণমূলের এই সুদীর্ঘ ও নিবিড় সম্পর্কের সুতোটা ছিঁড়তে শুরু করে কেন্দ্রীয় এজেন্সির তদন্তে। গত ৮ জানুয়ারি সল্টলেকের আই-প্যাক দফতর এবং সংস্থার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক প্রতীক জৈনের বাড়িতে তল্লাশি চালায় ইডি। সেই সময় এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছিল কলকাতা। ইডি তল্লাশি চলাকালীন খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্য সরকারের আধিকারিকদের নিয়ে প্রতীকের বাড়িতে হাজির হন। অভিযোগ ওঠে, তল্লাশি চলাকালীনই সেখান থেকে ল্যাপটপ, ফাইল ও নথিপত্র বের করে আনেন তিনি। এই ঘটনা নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত জল গড়ায়।

কফিনে পরের পেরেক ছিল ভিনেশ চাণ্ডেলের গ্রেফতারি। গত ১৩ এপ্রিল, যখন বাংলায় ভোটের দামামা পুরোদমে বাজছে, ঠিক তখনই জিজ্ঞাসাবাদের পর আই-প্যাকের আরেক প্রতিষ্ঠাতা ভিনেশ চান্ডেলকে গ্রেফতার করে ইডি। ১৪ এপ্রিল আদালত তাঁকে ১০ দিনের ইডি হেফাজতের নির্দেশ দেয় এবং পরবর্তীতে ২৩ এপ্রিল তাঁকে জেল হেফাজতে পাঠানো হয়। অবশেষে, বাংলায় বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণ মিটতেই স্বস্তি পান ভিনেশ। দিল্লির পাতিয়ালা হাউস কোর্ট তাঁর জামিন মঞ্জুর করে।

আই-প্যাক কর্তারা জামিন পেলেও, বাংলায় যে কর্পোরেট রাজনীতির দোকানে পাকাপাকিভাবে তালা পড়ে গেল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, একটি পেশাদার সংস্থাকে দিয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে দলের যে স্বাভাবিক সাংগঠনিক কাঠামো বা 'গ্রাসরুট বন্ডিং' থাকে, তা ক্রমশ ফিকে হয়ে এসেছিল। আর সেই কারনেই ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে 'অগ্নিকন্যা' মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের।‌



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন