Breaking

Post Top Ad

Your Ad Spot

মঙ্গলবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২২

Tour : স্মৃতিভান ভূমিকম্প স্মারক, জাদুঘর এবং কচ্ছের রন

Ron-of-Kutch

স্মৃতিভান ভূমিকম্প স্মারক, জাদুঘর এবং কচ্ছের রন

অজয় মজুমদার

একে একে সদস্যরা সবাই রেডি হয়ে ডাইনিং রুমে চলে এল৷ আজকে ব্রেকফাস্টে বিশেষ মেনু হল নান পুরী এবং ঘুগনি, সঙ্গে মিষ্টি৷ সবাই তৃপ্তির সঙ্গে খেয়ে পানীয় জল নিয়ে গাড়িতে উঠল। ভূজ থেকে আমাদের গাড়ি ছাড়লো ঠিক সকাল ন'টায়। দুদিকের মোহময় পরিবেশ দেখতে দেখতে আমরা যাচ্ছি৷ মাঝে মধ্যেই বেশ কিছু নতুন নতুন গাছের দেখা পাচ্ছি৷ কিছু কিছু গাছের বৈশিষ্ট্য আমাদের পশ্চিমবঙ্গ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। নাম না জানা গাছ৷ তবে ভূমিতে রুক্ষতা আছে। মনে হয় জায়গাটা রাজস্থানের কাছে বলেই গাছগুলি এরকম হয়। 

আমরা পৌঁছে গেলাম স্মৃতিভান ভূমিকম্প সড়ক ও জাদুঘরে। আজ যেভাবে ভূজ বেড়ে উঠেছে, মাধাপার এবং ভূজ উভয়ের সম্প্রসারণ এবং রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে ভূজ ও ডুঙ্গার প্রাকৃতিক আবাস রক্ষার একটি সুযোগ হিসাবে নিজেকে উপস্থাপন করে৷ এটি শহরকে একটি বিশাল বিস্তৃত খোলা জমি উপভোগ করার সুযোগ দেয়। যা ভবিষ্যতে অভাব হবে। স্মৃতিভান মেমোরিয়ালের মধ্যে যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়েছে যেমন- লাইব্রেরী এবং ডকুমেন্টশন সেন্টার, আর্টস অ্যান্ড কনফারেন্স ফেসিলিটিস, লিভিং হেরিটেজ, অ্যান্ট ইন্টার প্রিটেশন সেন্টার এবং দ্যা ওরিয়েন্টেশন সেন্টার– সবই হচ্ছে কচ্ছের প্রচারের লক্ষ্যে। 

এবার আমরা দেখলাম মিয়াওয়াকি বন। পৃথিবীর সবুজ আচ্ছাদন ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে৷ বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং জলবায়ুর পরিবর্তন আবারও আসতে চলেছে। আমরা ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রে বাস করছি। সেই সম্পর্কে সচেতন  হওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সারা দেশে ক্রমবর্ধমান সংখ্যা, ব্যক্তি ও সংস্থা মিয়াওয়াকি পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। বনায়নের নামকরণ করা হয়েছে জাপানি উদ্ভিদবিদ এবং উদ্ভিদ পরিবেশবিদ আকিয়া মীরাওয়াকির নামে। যিনি ছোট ছোট জমিতে বহু শহুরে বন বৃদ্ধির এই পদ্ধতির পথপ্রদর্শক৷ এইরকম সোশ্যাল ফরেস্ট্রি বা সামাজিক বনসৃজন ভূজ ও কচ্ছের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে৷

এখান থেকে আমরা গেলাম আয়না মহল। হামিরসার হ্রদের উত্তরপূর্ব কোনে অবস্থিত আয়না মহল প্রাসাদ৷ ১৭৬১ সালে রাও লাখপতজিন দ্বারা নির্মিত এবং রাম শিং মালাম দ্বারা ডিজাইন করা। এর স্থাপত্য যে কোন মানুষকে সৌন্দর্যে বিস্মিত করবে৷ ২০০১ সালে গুজরাট ভূমিকম্পের সময় প্রাসাদটি খুব একটা ধ্বংস করতে পারেনি৷ আয়না মহলের ঠিকানা হল দরবার গেট, ওল্ড ধাটিয়াফালিয়া, ভূজ, গুজরাট–৩৭০০১, ভারত। 

এবার গেলাম কচ্ছ মিউজিয়ামে৷ এটি হামিরসার ট্রাঙ্কের বিপরীতে৷ গুজরাটের প্রাচীনতম জাদুঘরে সারগ্রাহী এবং সার্থক প্রদর্শক রয়েছে টেক্সটাইল, অস্ত্র, রৌপ্যপত্র, ভাস্কর্য, বন্যপ্রাণী, কচ্ছ উপজাতির পোশাক এবং প্রত্নবস্তুর ডায়োরামা। জাদুঘরের একটি অংশ এই অঞ্চলে প্রাণবন্ত উপজাতীয় সংস্কৃতির জন্য নিবেদিত। কচ্ছ জাদুঘরটি ১৮৭৭ সালে মাহারাও খেঙ্গারাজি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল৷

এখান থেকে আমরা সোজা চলে গেলাম কচ্ছে রনে। ৭০ কিলোমিটার দূরে কচ্ছে রন৷ ওখানে যেতে হবে ঠিক সন্ধ্যার আগে আগে। যাতে সূর্যাস্তটাও দেখা যায় এবং পরিবেশটা উপলব্ধিতে আনা যায়। রন হিন্দি ভাষায় হল একটি লবণের জলাভূমি, যার বেশিরভাগ অংশ ভারতের গুজরাট রাজ্যে অবস্থিত এবং কিছু অংশ পাকিস্তানের সিন্ধুপ্রদেশে অবস্থিত। এটি প্রধান দুটি অংশে বিভক্ত৷ 

কচ্ছের বড় রন এবং কচ্ছের ছোট রন৷ কচ্ছের রন গুজরাটের থর মরুভূমির জৈব-ভৌগলিক এলাকায় এবং সিন্ধুপ্রদেশের কিছু অংশে অবস্থিত৷ এটি একটি ধাতুভিত্তিক সমুদ্রপৃষ্ঠ অঞ্চল, রন শব্দ লবণ মার্শ অর্থ সজ্জা সঙ্গে পর্যায়ক্রমে, স্থল উদ্ভিদ যেখানে বাড়তি উদ্ভিদ বৃদ্ধি৷ মরুভূমির ১০,০০০ বর্গ মিটারের বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে৷ রাজ্যের কচ্ছ রনের উত্তর-পূর্ব কোণে লুনি নদী রয়েছে, যার উৎপত্তি রাজস্থানে৷ 

কচ্ছের রন বিভিন্ন পরিবেশ বিশিষ্ট৷ যার মধ্যে রয়েছে ম্যানগ্রোভ এবং মরুভূমি উদ্ভিদ যেমন-ক্যাকটাস ও স্যাকেলিনা জাতীয়৷ কচ্ছ রন ঘাষভূমি এবং মরুভূমি বন্যপ্রাণীগুলির আবাসস্থল৷ কচ্ছের নিজস্ব ভাষা হল ইন্দো-আর্য ভাষা৷ তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সিন্ধি ভাষার গুজরাটি প্রভাবিত উপভাষা হিসেবে বিবেচিত। কচ্ছের রনে প্রচুর নীলগাই পাওয়া যায়। 

কচ্ছের রন ভূ-ভাগ দেখে সবাই অবাক হয়৷ বছরের ছ-মাস ডুবে থাকে সমুদ্রের নিচে। কিন্তু সেই লবণাক্ত জল সমুদ্রে ফিরে আসার আগে ২৮ হাজার বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত মরুভূমিকে দিয়ে যায় পুরু লবনের আস্তরণ৷ স্থানীয় ভাষায় নুনকে বলে মিঠু৷ সারা পৃথিবীতে নুনের জোগানে তিন নাম্বারে আছে কচ্ছ। তবে লবণ উৎপাদনের সঙ্গে মানুষের জীবন যাপন কিন্তু অত্যন্ত কষ্টকর। ৫০ থেকে ৬০ বছরের বেশি কেউই বাঁচে না৷ 

সারাদিন রোদের তাপে ওই লবণাক্ত জলে মাটিতে ভিজে কাজ করার সময় বহু রোগ শরীরে বাসা বাঁধে৷ এই রোগগুলি হল পেশাগত রোগ। প্রকৃতি এইভাবে এখানে মানবাধিকারকে গ্রাস করছে। কচ্ছের শেষ গ্রাম হলো- ধোরাধো। বেশ কিছুদিন আগেও যারা কচ্ছের রন দেখতে যেতেন, তারা ভূজ শহরে থাকতেন৷ কারণ, রাস্তা, জনপদ কিছুই ছিল না। এখানে থাকতেন মালদারি উপজাতির কিছু মানুষ, যারা জাতিতে মুসলমান৷ ২০ শতাংশ দলিত হিন্দু এখানে থাকতেন৷ পরবর্তীকালে কচ্ছ অঞ্চলের উন্নতি ঘটেছে। 

সূর্যাস্তের ছবি তোলা হলো৷ মানিদা ও বৌদি কচ্ছের মানুষের ড্রেস পরে এলেন। আমি ওদের ছবি তুলে দিলাম। ওরা এই নোনা প্রকৃতির বুকে আপ্লুত হয়ে পড়েছিল। মনে হচ্ছিল, আমরা একটা ছোট্ট দ্বীপে দাঁড়িয়ে আছি। প্রকৃতি সত্যিই সুন্দর। আমরা আবার ভূজ শহরে ফিরে এলাম রাত নটা নাগাদ৷ এখানে সাড়ে আটটার মধ্যে দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। অনেকেরই কেনাকাটা হলো না৷ রাতে হোটেল তুলসিতে ফিরে এলাম। সবাই খুব ক্লান্ত। রাতে সবাই খেয়ে নিয়ে সেদিনের মতো বিশ্রাম নিতে যে যার ঘরে চলে গেল।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন