Breaking

Post Top Ad

Your Ad Spot

রবিবার, ২০ মার্চ, ২০২২

গ্রামীন অর্থনীতি বদলের লক্ষ্যে হাতে লাঙল উচ্চ শিক্ষিত যুবকদের

 ‌

The-plow-in-the-hands-of-highly-educated-youth

সমকালীন প্রতিবেদন : কেউ এমএ, বিএড। কেউ আবার ডবল এমএ। কেউ পোস্ট গ্রাজুয়েট করেছেন ইতিহাসে। কারও মাস্টার ডিগ্রি ইংরেজিতে। কেউ আবার লাইব্রেরি সায়েন্সে স্নাতক। কেউ পাশ করেছেন কম্পিউটার সায়েন্স। কিন্তু সকাল হলেই লাঙল কাঁধে মাঠে যান ওঁরা। লক্ষ্য একটাই, গ্রামের শ্রীবৃদ্ধি ঘটানো। এলাকার কৃষকদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন। আর এই স্বপ্নপূরণে ওঁরা নিজেরা উচ্চশিক্ষিত হয়েও সরকারি-বেসরকারি মোটা মাইনের চাকরির দিকে না ঝুঁকে বেছে নিয়েছেন নিজেদের বাপ-ঠাকুরদার কৃষিকাজের জীবিকাকে।দীনবন্ধু রায়, শঙ্কর রায়, শম্ভু রায়, সৌমিত্র রায়, মন্নু রহমানের মতো শিক্ষিত যুবকদের হাত ধরেই বদলে যাচ্ছে উত্তরবঙ্গের ময়নাগুড়ির গ্রাম। 

উন্নত চাষের লক্ষ্যে তাঁদের উদ্যম দেখে যেমন এগিয়ে এসেছে রাজ্যের কৃষিদপ্তর, তেমনই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে নাবার্ড। আর তাই জমিতে শুধু ফসল ফলানো নয়, উৎপাদিত ফসল বিক্রিতে গড়ে উঠেছে নিজস্ব বিপণন কেন্দ্র। সুগন্ধী কালো নুনিয়া ধান থেকে কেঁচো সার, হলুদ থেকে খাঁটি সর্ষের তেল সবই মিলছে সেখানে। চাহিদা ক্রমেই বাড়তে থাকায় নিজেদের ব্র্যান্ড তৈরির পাশাপাশি গ্রামেই প্রস্তুত হওয়া জ্যাম, জেলি, সস, আচার, ছাতু এসবও আসতে চলেছে বাগজান ফার্মার্স প্রোডিউসার কোম্পানি লিমিটেডের বিপণন কেন্দ্রে।

সালটা ২০১১। এগারো জন নিয়ে শুরু হয়েছিল পথচলা। তখন নাম ছিল বাগজান প্রগতিশীল ফার্মার্স ক্লাব। লক্ষ্যটা ছিল, উন্নত পদ্ধতিতে ফসল ফলিয়ে তাক লাগানো। পাশাপাশি, গ্রামের কৃষকদের বিজ্ঞানসম্মত চাষে আগ্রহী ও প্রশিক্ষিত করে তোলা। ধীরে ধীরে সেই স্বপ্নপূরণ সম্ভব হয়েছে অনেকটাই। একদিকে জৈব পদ্ধতি অনুসরণ, অন্যদিকে অপ্রচলিত চাষে জোর। 

এই দুইয়ের মিশেলে এলাকার কৃষকদের অর্থনীতির বুনিয়াদ যেমন অনেকটাই বদলে গিয়েছে, তেমনই বেড়েছে বাগজান ফার্মার্স প্রোডিউসার কোম্পানি লিমিটেডের লাভের পরিমাণও। একসময় বছরে টার্নওভার ছিল ২৫ হাজার টাকা। এখন তা ৩০ লক্ষ। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সদস্য সংখ্যাও। ১১ জন নিয়ে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, এখন সেই পরিবারে সদস্য ৫৯৫ জন।

ময়নাগুড়ির বাগজান গ্রামে বাড়ি দীনবন্ধু রায়ের। তাঁর হাত ধরেই গড়ে উঠেছিল বাগজান প্রগতিশীল ফার্মার্স ক্লাব। এখন বাগজান ফার্মার্স প্রোডিউসার কোম্পানি লিমিটেডের বোর্ড অব ডিরেক্টরের প্রধান তিনি। বললেন, 'বাবা মহেশ রায় বেশিদূর পড়াশোনা করতে পারেননি। সপ্তম শ্রেণির পর স্কুল যাওয়া বন্ধ করে চাষের কাজে লেগে পড়েন। চাষ করেই আমাদের দু'ভাইকে পড়িয়েছেন। দাদা বাবার সঙ্গে কৃষিকাজ করেন। আমি লাইব্রেরি সায়েন্স নিয়ে স্নাতক হয়েছি ঠিকই, কিন্তু চাকরির খোঁজ করিনি। বরং ভেবেছি, গ্রামের চাষিদের আধুনিক কৃষির পাঠ দিতে হবে। বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে কীভাবে চাষ করে বেশি লাভের মুখ দেখা যেতে পারে, তা জানাতে হবে। সেই লক্ষ্যেই কাজ শুরু করি। আজ অনেকটাই সফল।' 

দীনবন্ধুর কথায়, 'আমাদের কোম্পানিতে অন্তত ৩৫ জন ছেলে রয়েছেন, যাঁরা গ্রাজুয়েট। এদের মধ্যে অনেকেই পোস্ট গ্রাজুয়েট। ডবল এমএ। বিএড করেছেন। কিন্তু তাঁরাও চাষ করেন। কাঁধে লাঙল নেন। কেউ কেউ আবার চাষবাসের পাশাপাশি পার্ট টাইমে স্কুলে পড়ান। ছবি আঁকেন। এই যেমন শঙ্কর রায়, বিএ পাশ। চাষের পাশাপাশি ওঁর শখ ছবি আঁকা। শম্ভু রায় ইংরেজি ও এডুকেশনে এমএ। আমাদের কোম্পানির সদস্য। পাশাপাশি জল্পেশ হাইস্কুলের পার্শ্বশিক্ষক। সৌমিত্র রায় কম্পিউটার সায়েন্সে বিএসসি করেছেন। মন্নু রহমান ইতিহাসে এমএ। বিএড করেছেন।'

শম্ভু বলছিলেন, '‌আমরা চাষির ঘরের ছেলে। আমাদের গ্রামের চাষিদের দুরাবস্থা ছোট থেকেই নিজের চোখে দেখতে দেখতে বড় হয়েছি। বুঝেছি, আসলে চাষের যে আধুনিক প্রযুক্তি, তা আমাদের এই প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষকদের কাছে পৌঁছয়নি। কীভাবে বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে চাষ করতে হয়, তা জানেন না বেশিরভাগ চাষিই। তাছাড়া আমাদের মনে হয়েছে, শুধু ফসল উৎপাদন করে সরাসরি বিক্রি করে দিলে সেভাবে লাভ থাকে না। কিন্তু সেই ফসলকে যদি প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে ক্রেতার হাতে তুলে দেওয়া যায়, তা হলে লাভের পরিমাণ বাড়ে। এরপরই আমরা গ্রামের কয়েকজন শিক্ষিত ছেলে মিলে ফার্মার্স ক্লাব গড়ে তুলি। যার লক্ষ্য ছিল, গ্রামের চাষিদের আধুনিক চাষে রপ্ত করে এলাকার অর্থনীতির বুনিয়াদকে মজবুত করা।' 

মন্নু রহমান বললেন, 'শুধু যে আমরা কৃষকদের আধুনিক চাষের প্রশিক্ষণ দিয়েছি তা নয়। গ্রামের মহিলাদের হাঁস-মুরগি ও ছাগল পালনের ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে। প্রাণী পালনের মাধ্যমে যাতে বাড়ির মহিলারা নিজেদের হাতখরচ জোগাড় করতে পারেন। এমনকী তাঁদের কাছে দুটো পয়সা থাকতে পারে, তা বোঝানো হয়েছে। আমাদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন গ্রামের অনেক মহিলাই প্রাণীপালন করছেন।' 

দীনবন্ধু বলেন, 'আমরা দেখেছিলাম গ্রামের অনেকেই সর্ষে চাষ করেন। কিন্তু সেভাবে দাম পান না। তখন সিদ্ধান্ত নিই, এই সর্ষে থেকে যদি তেল তৈরি করে বিক্রির ব্যবস্থা করা যায়, তা হলে কৃষকরা লাভের মুখ দেখতে পারেন। কৃষিদপ্তরের কাছে আবেদন করি। তাদের পাশাপাশি এগিয়ে আসে নাবার্ডও। আমরা সর্ষের তেল তৈরি করার মেশিন পাই। ২০১৫ সালে প্রথম তেল তৈরি করি। খাঁটি ওই সর্ষের তেলের নাম দিই 'প্রগতি'। তবে বাজারে আর পাঁচটা তেলের সঙ্গে এখন পাল্লা দিতে গিয়ে সমস্যা হচ্ছে। কারণ, আমাদের তেলের দাম বেশি হয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্রেতা মুখ ফেরাচ্ছেন।' 

‌তবে হাল ছাড়তে নারাজ দীনবন্ধু, শম্ভুরা। বললেন, 'আমরা সম্পূর্ণ জৈবপদ্ধতিতে সুগন্ধী কালো নুনিয়া চাষ করাচ্ছি গ্রামের কৃষকদের দিয়ে। নিজেরাও চাষ করছি। সেই ধান থেকে চাল তৈরি করে তা বিক্রি করছি। অনলাইনেও পাওয়া যাবে আমাদের জিনিস। চাষিরা বাজারে কালো নুনিয়া চাল বিক্রি করে যে দাম পান, আমাদের কাছে তার চেয়ে এক টাকা হলেও বেশি পাচ্ছেন। আমরা এবার ঢেঁকি ছাঁটা ব্রাউন রাইস বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের কাছে পাওয়া যাবে সুগন্ধী গোবিন্দভোগ, পায়জাম আতপ চাল। অনেককেই মিশ্র মাছ চাষে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। দোমোহনি ১, দোমোহনি ২ এবং ময়নাগুড়ি- এই তিনটি পঞ্চায়েত এলাকার ১৩টি গ্রামের কৃষকদের ঘুরে দাঁড় করানোই আমাদের লক্ষ্য।'‌

জলপাইগুড়ি সদরের সহকারী কৃষি অধিকর্তা (বিষয়বস্তু) মেহেফুজ আলম বাগজান ফার্মার্স প্রোডিউসার কোম্পানি লিমিটেডের কর্মকাণ্ড জানেন। নিয়মিত খোঁজখবর রাখেন। বললেন, 'সঙ্ঘবদ্ধভাবে যে কৃষিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় তার উদাহরণ ওরা। এককথায় জিরো থেকে হিরো। আর পাঁচটা কৃষক গোষ্ঠীর কাছে অবশ্যই দৃষ্টান্ত হতে পারেন দীনবন্ধুরা। তবে আরও ভালোভাবে কাজ করতে হবে। কৃষিদপ্তর সবসময় ওদের পাশে আছে।'‌

বাগজান ফার্মার্স প্রোডিউসার কোম্পানি লিমিটেডের কাছে পাওযা যাচ্ছে কালো নুনিয়া চাল ৮০/১০০ টাকা কেজি। পায়জাম আতপ চাল ৩০ টাকা কেজি। ব্রাউন রাইস ৩০ টাকা কেজি। গোবিন্দভোগ ১০০ টাকা কেজি। সর্ষের তেল ২০০ টাকা কেজি। চাষের জন্য জাপানি পুঁটির চারা ৫০০ টাকা কেজি। রুই, কাতলা, মৃগেলের চারা ৩০০ টাকা কেজি। মাগুর, শিঙ্গির চারা ৪ টাকা পিস।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন