Breaking

Post Top Ad

Your Ad Spot

Friday, 29 October 2021

উত্তর সম্পাদকীয় : যশোর রোড সম্প্রসারণ জরুরী, কিন্তু গাছ কেটে কখনোই নয়

 ‌

Jessore-Road-Expansion

        শোর রোড সম্প্রসারণ জরুরী, কিন্তু গাছ কেটে কখনোই নয়               

অজয় মজুমদার

জনসংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, উন্নয়ন সেভাবে না বাড়লেও জনজীবনে নেমে আসবে বিশৃঙ্খলা৷ অতিষ্ঠ হয়ে যাবে জনজীবন। যেমন এখন হয়। সকাল দশটা থেকে যশোর রোডে যানজট থাকে। রাস্তা পার হতে হয় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে৷ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য চুক্তির চাহিদা অনুযায়ী যশোর রোডের সম্প্রসারণ জরুরি হয়ে পড়েছে৷ এই অনিবার্য চাহিদার কথা কেউই আশা করি অস্বীকার করবেন না৷ কিন্তু প্রশ্ন হল– গাছ না কেটে অন্য ভাবনা কি ভাবা যায় না? অনেকেরই প্রশ্ন গাছগুলি বৃদ্ধ হয়েছে এবং বিপদজনকও বটে। সেইজন্য গাছ কাটা খুব প্রয়োজন। গাছ কেটে রাস্তা করলে পথ দুর্ঘটনা কমবে। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি- যশোর রোডের দু'দিকে রয়েছে বট, অশ্বত্থ, মেহগিনি, আম, শিরীষ গাছ৷ বিশাল আকারের গাছগুলির শাখা-প্রশাখা বহুদূর প্রসারিত। ইংরেজ শাসক যেমন একদিকে বন ধ্বংস করেছে, বহু গাছপালা নির্মূল করেছে, তেমনি বনসৃজন ও বৃক্ষরোপনও করেছে। তারা নিজের স্বার্থে হলেও তা তো আমাদেরই সম্পদ৷ সাম্রাজ্যবাদী, বিদেশি শাসক হয়েও তারা অনুসরণ করেছে ভারতের ঐতিহ্য৷ প্রিয়দর্শী অশোক, দূরদর্শী শেরশাহের আদর্শ৷ 

নেট জ্ঞান ভান্ডার থেকে জানা যায়- শিরীষের আয়ুকাল কমবেশি ৫০০ বছর, ৮০ ফুট উঁচু হয়ে ১০০ ফুট পরিধি জুড়ে ডাল পালা ছড়াতে পারে৷ এই গাছগুলি এখন তাদের মাঝ বয়সেও পৌঁছায়নি৷ আর প্রাকৃতিক নিয়মেই কিছু ডাল-পালা শুকিয়ে যায় ও বিপদজনক অবস্থায় আসতে পারে৷ এগুলোর সঠিক দেখভাল বন দপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট পুরসভা, পঞ্চায়েতের দায়িত্বের সঙ্গে করলে, দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে না৷ তাছাড়া, গাছের গায়ে পেরেক ও গজাল দিয়ে বিজ্ঞাপন মেরে বিদ্ধ করা হচ্ছে। নিষেধ করার কেউ নেই। দায়বদ্ধ তারাই, যারা গাছ রক্ষনাবেক্ষনার কথা বলবে তারাই। রাজ্য বন দপ্তর জানাচ্ছে, রাস্তা সম্প্রসারণ করতে গিয়ে ৪০৩৬ টি গাছ কাটা পড়বে। কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়ার পর তৈরি হচ্ছে তার নকশা ও পরিকল্পনা৷ কিন্তু একবারও গাছগুলিকে তার অবস্থানে রেখে রাস্তা সম্প্রসারনের কথা ভাবা হচ্ছে না৷ অথচ বনগাঁ শহরের কাছাকাছি জয়ন্তীপুর থেকে পেট্রাপোল সীমান্ত পর্যন্ত বড় বড় গাছগুলিকে মাঝখানে রেখে দুই পাশে রাস্তা তৈরি হয়েছে৷ 

বারাসত থেকে বনগাঁ সীমান্ত পর্যন্ত ৬১ কিলোমিটার রাস্তা। শহরগুলির মধ্যে রাস্তায় গাছ নেই বললেই চলে। সেই গাছগুলিকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অজুহাতে ছেদন করা হয়েছে৷ রাস্তার পাশে শহর ছাড়িয়ে নয়ানজুলিতে পূর্ত দপ্তরের জমি রয়েছে৷ সেখানে দুপাশে চার লেনের রাস্তা তো করা যেতই। সেখানে গড়ে ছয় লেনের রাস্তা হয়ে যেতো। এই ব্যবস্থার বাইরে অবশ্যই বনগাঁ, গাইঘাটা, চাঁদপাড়া, হাবরা, অশোকনগর, দত্তপুকুর ও বামুনগাছি শহর বাদ দিয়ে যেটুকু রাস্তা পাওয়া যেতো, তা তো কম নয়৷ ৬১ কিলোমিটারের মধ্যে ১৫ কিলোমিটার বাদ দিলেও ৪৬ কিলোমিটার রাস্তায় গাছ বাঁচিয়ে রাস্তা করা যেতো কিনা কর্তৃপক্ষকে ভাবার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল বৃক্ষ প্রেমীদের পক্ষ থেকে। আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কে যে সব গাছ কাটা হয়েছে, তার পরিবর্তে সেভাবে কোনও গাছ লাগানোর উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি। অথচ মহারাষ্ট্র, পুনে এবং কুরুক্ষেত্র থেকে চন্ডিগড় হাইওয়েতে রাস্তার মাঝখান দিয়ে কি সুন্দর অরণ্য তৈরি করা হয়েছে৷ পুনে শহরে নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে বড় বড় গাছকে এনে রাস্তার মাঝখানে লাগানো হয়েছে৷ চার বছরের মধ্যে গাছগুলোতে ফলও এসেছে৷ সেখানে দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছিল করপরেশন৷ তাহলে গাছ কাটলে নতুন গাছ লাগানো বা পরিচর্যার কোনও উদ্যোগই নেওয়া পশ্চিমবঙ্গে সম্ভব নয় বলেই মনে হয়৷ কারণ পূর্ব অভিজ্ঞতা আমাদের পজিটিভ ভাবনায় ভাবাতে পারেনি৷

গাছ না থাকলে কি হয় তা আশা করি সকলেই জানেন৷ তবুও অভিজ্ঞতাগুলি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া যাক৷ টাইমস অফ ইন্ডিয়া ৭ মার্চ ২০১৩, যশোর রোড ইকো হেরিটেজ আন্ডার অ্যাক্স যশোর রোড দ্রুত তার গ্রীন হেরিটেজ হারাচ্ছে বেআইনি কাঠ ব্যবসার জন্য৷ কিন্তু ২০১৭ সালে গ্রীন হেরিটেজ কেবল বিপন্ন নয়, সে বিলুপ্তির পথে৷ আমেরিকা, জাপান, ইউরোপ প্রভৃতি উন্নতশীল দেশগুলির পরিবেশনীতি ভারত-বাংলাদেশ প্রভৃতি উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এক বিশাল সংকটের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে৷ তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশের গরিব মানুষকে গিনিপিগে পরিণত করেছে৷ পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে সমাজের সর্বাত্মক প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে৷ গতবছর কোপেনহেগেনে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মূল আলোচনার বিষয় ছিল- পরিবেশ দূষণ করার অধিকার কোন শিবিরের থাকবে, তাই নিয়ে বিরোধ৷ গোটা দুনিয়া এখন দুই ভাগে বিভক্ত। উন্নত এবং উন্নয়ন৷ বিশ্ব উষ্ণায়ন ঠেকাতে হলে বায়ুমন্ডলে গ্রিন হাউস গ্যাসের ঘনত্ব কমানো জরুরি৷ তাপমাত্রা কতটা বাড়তে দেওয়া যেতে পারে, তার একটি সর্বস্বীকৃত মাপকাঠি আছে-প্রাক শিল্পায়ন যুগের তাপমাএার চেয়ে দুই ডিগ্রী বেশি৷ এর বেশি তাপমাত্রা বাড়লেই বিপদ৷ এখন বাতাসে গ্রিন হাউস গ্যাসের পরিমাণ ৪৮০০ কোটি টন কার্বন ডাই অক্সাইডের সমমূল্য৷ তাপমাত্রাকে সেই দুই ডিগ্রির সীমায় বেঁধে রাখতে গেলে ২০২০ সালের মধ্যে একে ৪৪00 কোটি টন কার্বন ডাই অক্সাইড এর সমতুল্য স্তরে নামিয়ে আনতে হবে৷ সহজভাবে বললে দুনিয়া দূষণের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে। এখন খুব দ্রুত পিছু হাটতে হবে৷

গাছ কাটার জন্য কয়েকটি ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিতে চাই৷ ২০০৯ সালে সুন্দরবনের আয়লা, ২০১৩ সালে উত্তরখন্ডের ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ি ধ্বস। ২০১৪ এবং ২০১৬ তে চেন্নাই শহর অতিবৃষ্টির ফলে বেশ কয়েকদিন ধরে প্রায় ডুবে ছিল৷ কেড়ে নিয়েছিল হাজার হাজার মানুষের প্রাণ, তাদের জীবিকা, আশ্রয়৷ ফ্লাইওভার তৈরীর জন্য ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে ব্যাঙ্গালোর শহরে রাস্তার পাশের ৮৫০ টি গাছ কেটে ফেলা হয়েছিল৷ তাকে রুখে দিতে পথে নেমেছিল অসংখ্য মানুষ৷ তারপরই দিল্লি শহরে বাতাসে এক নাগাড়ে ধুলো ও ধোঁয়াযুক্ত ঘোলাটে কুয়াশা দেখা দেয়৷আচ্ছা গাছ না কেটে কিভাবে আমরা বিকল্প ভাবনা ভাবতে পারি এবং প্রকৃতিকে বাঁচাতে পারি সে বিষয়ে ভাবা যাক। নদী মাতৃক বাংলার প্রাচীন ও মধ্যযুগে জলপথ ছিল প্রধান বাণিজ্য পথ। এই পথ ছিল সুলভ। ঔপনিবেশিক বিদেশি সরকারের আমলে এই জনপদ ধীরে ধীরে অবহেলিত হতে থাকলো৷ গুরুত্ব পেল রেলপথ, তার বাণিজ্য স্বার্থে। গাছ বাঁচিয়ে কি রাস্তার উন্নয়ন সম্ভব নয়? নতুন সড়ক কি নির্মাণ করা যায়না? শিয়ালদহ-বনগাঁ রেলপথ কে সম্প্রসারণ করে ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা যায় না ? নদী ও জলপথ গুলি কি পুনরুদ্ধার করা যায় না ? 

বেনারসে অনুষ্ঠিত ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে বিজ্ঞানী ডঃ টি এম দাস তাঁর ভাষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন– ৫০ বছরে একটি বড় গাছ মানুষকে দেয় :‌ ১) আড়াই লক্ষ টাকার অক্সিজেন ২) জৈব প্রোটিনের রূপান্তর ঘটে কুড়ি হাজার টাকার ৩) ভূমিক্ষয় রোধ ও ভূমির উর্বরতা নিয়ন্ত্রণ আড়াই লক্ষ টাকা ৪) জলের পূর্ণ ব্যবহার ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ তিন লক্ষ টাকা ৫) পাখি, কাঠবিড়ালি, পোকামাকড় ও লতাপাতাকে আশ্রয়দান আড়াই লক্ষ টাকা ৬) পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ ৫ লক্ষ টাকা৷ মোট ১৫ লক্ষ ৭০০ টাকা৷ সরকার যখন গাছ কাটার কথা ভাবছেন, পাশাপাশি 'পরিবেশ' ভাবনার কথাও ভাবতে হচ্ছে৷ 'দূষণ মুক্তি'-র আন্তর্জাতিক দায়ও বর্তেছে তাঁর উপর (আর্থ সামিট, প্যারিস- ২০১৬) সম্ভবত দপ্তরে দপ্তরে সমন্বয় না থাকার কারণে উন্নয়নের নামে এমন আত্মধ্বংসী সিদ্ধান্ত সরকারকে নিতে হয়েছে বা হচ্ছে।

এবার চিপকো আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দিতে চাই৷ চিপকো বা গাছকে বুকে জড়িয়ে ধরো৷ আন্দোলন সম্ভবত, বিশ্বের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তৃণমূল ভিত্তিক বাস্তব্য উন্নয়ন বা ইকো ডেভলপমেন্ট আন্দোলন‌। এলাহাবাদের এক ক্রীড়া সামগ্রী কারখানার গোপেশ্বর আসেন বন দপ্তরের বৈধ অনুমতি নিয়ে৷ উদ্দেশ্য, মন্ডল গ্রামের কাছে ১০ টি অ্যাশ গাছ কাটা৷ গ্রামবাসীরা সবিনয়ে তাঁদের গাছগুলির না কাটার অনুরোধ করেন৷ কিন্তু অনুনয়-বিনয় ইত্যাদি দ্বারা কোনভাবেই তাদের নিরস্ত করতে না পেরে গ্রামবাসীরা চিহ্নিত গাছগুলিকে বুকে জড়িয়ে ধরার পরিকল্পনা নেন। সবশেষে গাছ কাটার লোকেরা খালি হাতে ফিরে যেতে বাধ্য হন৷ কয়েক সপ্তাহ পরে একই ঠিকাদার গোপেশ্ববের ৮০ কিলোমিটার দূরের গ্রাম রামপুর ফাটাতে উপস্থিত হন৷ তাদের হাতে অরণ্য দপ্তরের নতুন অনুমতিপত্র৷ খবর পেয়ে গোপেশ্বর থেকে জনগণ ছুটে যান রামপুর ফাটায়৷ এবারও ঠিকাদারকে ব্যর্থ হয়ে ফিরতে হয়৷ চিপকো আন্দোলন চরম রূপ নিল ১৯৭৪ সালে৷ নেতৃত্বে ছিলেন ৫০ বছর বয়স্কা নিরক্ষর পৌড়া গৌরী দেবী৷ ইতিমধ্যে চিপকো আন্দোলন সম্বৃদ্ধ হয়ে উঠেছে সুন্দরলাল বহুগুণা এবং চন্ডী প্রসাদ ভাট– এই দুই বিশিষ্ট নেতার নেতৃত্বে৷ অবশ্য একথা সত্যি যে হিমালয় বৃক্ষচ্ছেদন বন্ধ করার লক্ষ্য পূর্ণ হয়নি। 

চিপকো আন্দোলন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা ও স্থানীয় সহায় সম্পদ ব্যবস্থাপনা আমলাতন্ত্রের বিষয়ে জনসচেতনতা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে৷ সেইসঙ্গে অহিংস কর্মকেন্দ্রিক পদ্ধতিতে পরিবেশকে রক্ষা করার যুগোপযোগী একটি পথের সন্ধান দিয়েছে৷ আসলে এখানকার মানুষ প্রকৃতি সুস্থতা বিষয়ের থেকেও তথাকথিত উন্নয়নের উপর বেশি জোর দেন৷ অনেকেরই ধারণা আছে, গাছ না কাটলে রাস্তা চওড়া করা সম্ভব নয়৷ বিকল্প পথে যে ভাবা যেত, সে বিষয় যে ভাবনা হয় না৷ এই সরল সমীকরণই  বেশিরভাগ মানুষের অন্তরে গেঁথে গেছ ৷ সেভাবে প্রাকৃতিক সুস্থতা বিষয়ে কোনও জনসচেতনতা গড়ে ওঠেনি। এই বিষয়ে উত্তর ২৪ পরগনা জেলা এপিডিআর জনগণকে সচেতন করে তোলবার জন্যে পথে নামে। যদিও তাদের ক্ষমতা যথেষ্টই কম৷ তাই তাদের পাশে সুনাগরিকদের জনসচেতনার কাজে এগিয়ে আসার আহ্বান জানায়। তাদের ডাক পরিবেশের ডাক৷ তাদের ডাক জীবকুলকে রক্ষা করার ডাক৷ তাদের ডাক মানুষকে সার্বিকভাবে বাঁচিয়ে রাখার ডাক। উত্তর পুরুষকে স্বাচ্ছন্দে বসবাসের স্থান করে দেওয়ার ডাক৷



No comments:

Post a Comment