সমকালীন প্রতিবেদন : দুর্গাপুজোয় দর্শনার্থীদের ভিড় সামলাতে এবং যানজট এড়াতে এবার আগেভাগেই বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছে বনগাঁ জেলা পুলিশ। তৃতীয়া থেকেই বনগাঁ শহরে যানবাহন চলাচলের উপর নিয়ন্ত্রণ জারি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দশমী পর্যন্ত এই বিধিনিষেধ কার্যকর থাকবে বলে পুলিশ প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিদিন দুপুর ১টা থেকে যান নিয়ন্ত্রণ শুরু হবে। তবে শহরের ভিড়ের পরিস্থিতি এবং দর্শনার্থীদের যাতায়াতের চাপ বিবেচনা করে প্রয়োজনে এই সময়সূচিতে পরিবর্তন করা হতে পারে। শুক্রবার বনগাঁর নীলদর্পণ হলে বনগাঁ পুলিশ জেলার উদ্যোগে আয়োজিত পুজো প্রস্তুতি সংক্রান্ত সমন্বয় সভায় এই পরিকল্পনার কথা জানান পুলিশ সুপার বিদিশা কলিতা দাশগুপ্ত।
আসন্ন দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে সীমান্ত শহর বনগাঁয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের মণ্ডপ দর্শন আরও সহজ ও সুশৃঙ্খল করতে একাধিক পদক্ষেপ করেছে পুলিশ। প্রতিবছরই পুজোর দিনগুলিতে শহরের বিভিন্ন মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ব্যাপক ভিড় জমে। সেই ভিড়ের চাপে যানজট ও বিশৃঙ্খলা এড়াতে এবার আধুনিক প্রযুক্তির উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তারই অঙ্গ হিসেবে শুক্রবার প্রকাশ করা হয় বিশেষ পুজো গাইড ম্যাপ। পুলিশের আশা, এই উদ্যোগের ফলে দর্শনার্থীরা সহজে নিজেদের পছন্দের মণ্ডপে পৌঁছাতে পারবেন এবং শহরের রাস্তায় অযথা ঘোরাঘুরি ও যানজটের সমস্যা অনেকটাই কমবে।
এবারের পুজো গাইড ম্যাপের অন্যতম আকর্ষণ কিউআর কোড এবং জিপিএস-ভিত্তিক পথনির্দেশ ব্যবস্থা। গাইড ম্যাপে থাকা কিউআর কোড স্মার্টফোনে স্ক্যান করলেই দর্শনার্থীরা গুগল ম্যাপের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পুজো মণ্ডপের অবস্থান ও সেখানে পৌঁছানোর পথ জানতে পারবেন। নিজের বর্তমান অবস্থান থেকে পছন্দের মণ্ডপের দূরত্ব কতটা, কোন রাস্তা দিয়ে গেলে সহজে সেখানে পৌঁছানো যাবে, সেই সংক্রান্ত তথ্যও পাওয়া যাবে। যানজট এড়িয়ে বিকল্প রাস্তা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও এই ব্যবস্থা সহায়ক হবে বলে মনে করছে পুলিশ প্রশাসন।
শহরে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রবেশপথের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় মোট সাতটি ড্রপগেট তৈরি করা হয়েছে। পুজোর দিনগুলিতে পরিস্থিতি বুঝে এই ড্রপগেটগুলির মাধ্যমে যানবাহনের প্রবেশ ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে। দর্শনার্থীদের ভিড় এবং জরুরি পরিষেবার কথা মাথায় রেখেই এই ব্যবস্থা কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শুধু যান নিয়ন্ত্রণ বা প্রযুক্তিনির্ভর পথনির্দেশ নয়, পুজোর দিনগুলিতে শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। মণ্ডপ চত্বর, শহরের সরু গলি এবং জনবহুল এলাকায় দ্রুত পৌঁছে পরিস্থিতি সামাল দিতে পাঁচটি অত্যাধুনিক মোটরসাইকেলের আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয় এদিন। এই বাইক স্কোয়াড শহরজুড়ে নজরদারি চালাবে। কোথাও ভিড়ের চাপ বাড়লে কিংবা কোনও জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছনোই এই বিশেষ বাহিনীর অন্যতম উদ্দেশ্য।
শুক্রবারের সমন্বয় সভায় উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার বিদিশা কলিতা দাশগুপ্ত, রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী অশোক কীর্তনীয়া, দুই বিধায়ক স্বপন মজুমদার ও সোমা ঠাকুর, জেলা পুলিশের বিভিন্ন পদাধিকারী এবং দমকল ও বিদ্যুৎ দফতরের আধিকারিকেরা। আমন্ত্রিত অতিথিরা প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে পুজো গাইড ম্যাপ প্রকাশ করা হয়। পুজোর নিরাপত্তা ও যান নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কার পাস বিলি নিয়েও সতর্ক অবস্থান নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ প্রশাসন। প্রতিবছর পুজোর সময় কার পাস বণ্টনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে। এবার সেই ধরনের অভিযোগ বা অনিয়ম এড়াতে কার পাস ইস্যু করার ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দেওয়া হবে বলে সভায় জানানো হয়।
এই বিষয়ে খাদ্যমন্ত্রী অশোক কীর্তনীয়া বলেন, দুর্গাপুজো সাধারণ মানুষের উৎসব। তাই কার পাস দেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে, যাতে কোনওভাবেই সাধারণ মানুষের যাতায়াতে সমস্যা তৈরি না হয়। তাঁর অভিযোগ, গত বছর কার পাস নিয়ে একদল উচ্ছৃঙ্খল যুবক মোটরবাইক চালিয়ে তাণ্ডব চালিয়েছিল। তাদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্রও ছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ বছরের কার পাস কাদের দেওয়া হচ্ছে, তা যথাযথভাবে যাচাই করার জন্য পুলিশ প্রশাসনকে সতর্ক করেন মন্ত্রী। অতীতের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করারও বার্তা দেন তিনি।
পুজোর প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত কর্মসূচির পাশাপাশি এদিন পুলিশের সামাজিক উদ্যোগও বিশেষ গুরুত্ব পায়। বনগাঁ জেলা পুলিশের উদ্যোগে বিনামূল্যে চক্ষু পরীক্ষা শিবিরের আয়োজন করা হয়েছিল। ওই শিবিরে পরীক্ষা করার পর চশমার প্রয়োজন রয়েছে, এমন ২০ জনকে চিহ্নিত করা হয়। শুক্রবারের অনুষ্ঠানে তাঁদের হাতে চশমা তুলে দেওয়া হয়। পাশাপাশি ২৫ জন অভাবী মানুষের হাতে নতুন বস্ত্র তুলে দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে আসন্ন দুর্গাপুজোয় বনগাঁ শহরে নিরাপত্তা, যান নিয়ন্ত্রণ এবং দর্শনার্থীদের সুবিধার উপর বিশেষ জোর দিচ্ছে জেলা পুলিশ। প্রযুক্তিনির্ভর গাইড ম্যাপ, সাতটি ড্রপগেট, পাঁচটি অত্যাধুনিক মোটরবাইকে নজরদারি এবং কার পাস বিলিতে কড়াকড়ির মাধ্যমে পুজোর দিনগুলিতে শহরকে সুশৃঙ্খল রাখাই প্রশাসনের লক্ষ্য। এখন এই পরিকল্পনাগুলির বাস্তবায়ন এবং পুজোর ভিড়ের পরিস্থিতির উপরই নির্ভর করবে বনগাঁয় উৎসবের দিনগুলিতে যান চলাচল কতটা স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়।









কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন