সমকালীন প্রতিবেদন : দেশে শিক্ষার প্রসার বাড়লেও সেই অনুপাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। উচ্চশিক্ষার ডিগ্রি হাতে নিয়েও উপযুক্ত চাকরি পাচ্ছেন না বহু তরুণ-তরুণী। নীতি আয়োগের রিপোর্টে উঠে আসা পরিসংখ্যান সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩ শতাংশ। অথচ সামগ্রিক বেকারত্বের হার ৩.২ শতাংশ। অর্থাৎ, দেশের সামগ্রিক বেকারত্বের তুলনায় উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে কাজ না পাওয়ার সমস্যা অনেক বেশি প্রকট।
সমস্যার আরেকটি দিকও সামনে এসেছে। নীতি আয়োগের রিপোর্ট অনুযায়ী, মাত্র ৮.২৫ শতাংশ স্নাতক তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পদে কাজ করছেন। ফলে উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরেও অনেককে যোগ্যতার তুলনায় কম দক্ষতানির্ভর কাজে যুক্ত হতে হচ্ছে। আবার অনেকে চাকরির বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে নতুন করে বিভিন্ন পেশাগত দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হল শিক্ষাব্যবস্থা এবং কর্মক্ষেত্রের চাহিদার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত জ্ঞান অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হচ্ছে না। প্রযুক্তি ও ডিজিটাল পরিষেবার দ্রুত পরিবর্তনের ফলে নিয়োগকর্তাদের চাহিদাও বদলাচ্ছে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাঠ্যক্রম ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার উন্নতি সব ক্ষেত্রে হচ্ছে না।
অন্যদিকে, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের কাজের প্রত্যাশাও বেকারত্বের পরিসংখ্যানে প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদদের একাংশ। অনেকেই কম বেতনের কাজের পরিবর্তে স্থায়ী ও সম্মানজনক চাকরির জন্য অপেক্ষা করেন। অথচ দেশের কর্মসংস্থানের বড় অংশই অসংগঠিত ক্ষেত্রে। ফলে শিক্ষিত চাকরিপ্রার্থীদের প্রত্যাশা এবং বাস্তব কর্মসংস্থানের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ‘ইন্ডিয়া এমপ্লয়মেন্ট রিপোর্ট ২০২৪’ অনুযায়ী, কৃষিক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে আসা শিক্ষিত তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত উন্নত আয়ের কাজ তৈরি করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগের গুরুত্বও উঠে এসেছে। ‘ইকোনমিক সার্ভে ২০২৫-২৬’ অনুযায়ী, ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র ০.৬৪ থেকে ০.৬৫ শতাংশ গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় হয়। তুলনায় আমেরিকা, চিন ও দক্ষিণ কোরিয়ায় এই খাতে বিনিয়োগের হার যথাক্রমে ৩.৪৮, ২.৪৩ এবং ৪.৯১ শতাংশ।
ভারতে গবেষণা ও উন্নয়নে বেসরকারি ক্ষেত্রের অবদানও তুলনামূলকভাবে কম। ২০২০-২১ সালে এই খাতে মোট ব্যয়ের ৩৬.৪ শতাংশ এসেছিল বেসরকারি সূত্র থেকে। বর্তমানে সেই হার বেড়ে ৪১ শতাংশ হলেও বিশ্বের শীর্ষ দশ অর্থনীতির দেশগুলিতে গড় হার প্রায় ৬৮ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষিত বেকারত্ব কমাতে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো, বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিল্পক্ষেত্রের যোগাযোগ শক্তিশালী করা এবং শ্রমনির্ভর উৎপাদন ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি, চাকরির বাজারের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষাক্রম ও পেশাগত প্রশিক্ষণে পরিবর্তন আনতে হবে। নচেৎ উচ্চশিক্ষার প্রসার ঘটলেও ডিগ্রিধারীদের উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সংকট থেকেই যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন