Breaking

Post Top Ad

Your Ad Spot

বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬

নেপালে আকস্মিক হড়পা বানে ধসে পড়ল জনজীবন, নিখোঁজ শতাধিক ভারতীয়-সহ ৪০০ পর্যটক

 

Sudden-Harappa-Ban-in-Nepal

সমকালীন প্রতিবেদন : আকাশ ছিল একেবারে পরিষ্কার, রোদঝলমলে সকাল। কোনো মেঘের আনাগোনা কিংবা বৃষ্টির ছিটেফোঁটাও ছিল না উত্তর নেপালে। কিন্তু সেই শান্ত সকালই মুহূর্তে পরিণত হলো এক নরককুণ্ডে। চিনের তিব্বত সীমান্ত থেকে তীব্র গতিতে নেমে আসা কাদা ও জলের প্রকাণ্ড স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে গেল নেপালের একাধিক গ্রাম, রাস্তা, বাজার এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেতু। তিব্বতের বাঁধ ভাঙা বা হিমবাহ-হ্রদ উপচে পড়া জল ও পলি ভোতেকোশি নদীতে উপচে পড়ায় সূচনা হয় এই প্রলয়ংকরী হড়পা বানের। এই আচমকা বিপর্যয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে নেপালের রাসুয়া, নূয়াকোট এবং ধাদিং জেলা। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত অন্তত ১৬ জনের প্রাণহানি নিশ্চিত করা সম্ভব হলেও ধ্বংসস্তূপ এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে মৃতের সংখ্যা আরও বহুগুণ বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে কৈলাস-মানস সরোবর দর্শনে যাওয়া পর্যটকদের পরিণতি। নেপাল পর্যটন পর্ষদ এবং স্থানীয় সংবাদ সংস্থার সূত্রের খবর, হড়পা বানের পর থেকে অন্তত ৩৮৪ জন পর্যটক নিখোঁজ। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১৪২ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন (যাঁদের মধ্যে ৩৭ জন অনাবাসী ভারতীয়)। তিনটি পৃথক ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে তাঁরা কৈলাস যাত্রায় বেরিয়েছিলেন। কিন্তু ধস ও প্রবল স্রোতের কারণে বুধবার দুপুর পর্যন্ত দু-একজন ছাড়া কারও সঙ্গেই আর যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। এছাড়াও নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন মালয়েশিয়া, ব্রিটেন, আমেরিকা, সাউথ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং নেদারল্যান্ডসের নাগরিকরা। সাধারণ নাগরিকের পাশাপাশি অন্তত ৪১ জন পুলিশ কর্মী ও ১৪ জন শুল্ক দপ্তরের কর্মীরও কোনো খোঁজ মিলছে না।

উজান থেকে নেমে আসা জলরাশি পাহাড়ের বুক চিরে বিদ্যুৎ ও সড়ক পরিকাঠামোকে ছারখার করে দিয়েছে। নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির (এনইএ) ছ’টি প্রধান জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সাবস্টেশন জল ও ধসের তোড়ে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত। ফলে দেশের এক বিশাল অংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। খেলনার মতো ভেঙে পড়ে বা ভেসে গিয়েছে একাধিক সংযোগকারী সেতু।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে ত্রাণ পৌঁছাতে কালঘাম ছুটছে উদ্ধারকারী দলগুলোর। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান এবং জলের তোড়ের মুখে পড়ে বিপদগ্রস্ত হয়েছেন স্বয়ং বিপর্যয় মোকাবিলা দলের সদস্যরাও। খোঁজ মিলছে না অন্তত ২৬ জন নেপাল পুলিশ ও ৭ জন সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর জওয়ানের। এরপরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেপাল সেনা তলব করা হয়েছে। সেনার বিশেষ হেলিকপ্টার ও বিপর্যয় মোকাবিলা দল দুর্গম অঞ্চলে আকাশপথে নজরদারি ও উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

উদ্ভূত বিপর্যয় পর্যালোচনা করতে 'ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি'-র জরুরি বৈঠক ডেকেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ। তড়িঘড়ি রেড ক্রস, স্কাউট এবং বিশেষ চিকিৎসকদের নিয়ে গঠিত সমন্বিত উদ্ধারকারী দল কাজ শুরু করেছে। প্রশাসন থেকে নদীর তীরবর্তী মানুষকে উঁচু ও নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নেপালের এই ভয়াবহ দুর্যোগ ফিরিয়ে আনছে প্রায় ২৮ বছর আগের এক মর্মান্তিক স্মৃতি। ১৯৯৮ সালের আগস্টে উত্তরাখণ্ডের পিথোরাগড়ের মলপা গ্রামে একইভাবে ধস নেমে প্রাণ হারিয়েছিলেন ২২১ জন, যার মধ্যে ৬০ জনই ছিলেন কৈলাস-মানস সরোবরের পুণ্যার্থী। পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, বর্ষার স্বাভাবিক ধারার বাইরে গিয়ে এমন অতিপ্রাকৃতিক দুর্যোগ ও আগাম সতর্কবার্তাহীন হড়পা বানের মূলে রয়েছে প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া জলবায়ু ও বিশ্ব উষ্ণায়নের মারাত্মক প্রভাব।‌




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন