সমকালীন প্রতিবেদন : উত্তর ২৪ পরগনার হালিশহরে থানা হেফাজতে এক তৃণমূল কর্মীর অস্বাভাবিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রের চেহারা নিল এলাকা। রবিবার নিহত ওই দলীয় কর্মীর বাড়িতে শান্তনা জানাতে গিয়ে স্থানীয়দের অভূতপূর্ব ক্ষোভ ও নজিরবিহীন প্রতিবাদের মুখে পড়লেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কনভয় ঘিরে ধরে 'চোর' ও 'ডাকাতরানি' স্লোগান দেওয়ার পাশাপাশি গাড়ি লক্ষ্য করে কাদা, জুতো এবং বড় বড় ইট-পাথর ছোড়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার সূত্রপাত হালিশহর থানার লকআপে বিরজু কেয়ট (৩৮) নামের এক সক্রিয় তৃণমূল কর্মীর অস্বাভাবিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। নিহতের স্ত্রী জেনি শর্মা কেয়ট কাঁচরাপাড়া পুরসভার প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর। স্থানীয় এক মহিলার দায়ের করা লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে সম্প্রতি পুলিশ বিরজু কেয়টকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর বিরুদ্ধে তোলাবাজি, ভয় দেখানো, আর্থিক প্রতারণা এবং বেআইনি অস্ত্র আইন-সহ একাধিক জামিনঅযোগ্য ধারায় মামলা রুজু করা হয়।
গত শুক্রবার ব্যারাকপুর আদালতে পেশ করা হলে বিচারক তাঁকে ৫ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেন। পুলিশের দাবি, শনিবার সকালে থানা হেফাজতে থাকা অবস্থায় বিরজু আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তড়িঘড়ি তাঁকে কল্যাণীর জওহরলাল নেহরু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
পুলিশের এই অসুস্থতার দাবি মানতে নারাজ নিহতের পরিবার। তাঁদের অভিযোগ, লকআপের ভেতর পুলিশি নির্যাতনে ও বেধড়ক মারধরের ফলেই বিরজুর মৃত্যু হয়েছে। যদিও ব্যারাকপুর কমিশনারেটের পুলিশ মারধরের এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। এদিকে, রবিবার দুপুরে আচমকাই উত্তর ২৪ পরগনার বীজপুর থানা এলাকার হালিশহর ভূতবাগানে মৃত বিরজু কেয়টের বাড়িতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তৃণমূলের দুই সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দোলা সেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাড়ি এলাকায় পৌঁছতেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাড়ির পেছনে ধাওয়া করে 'চোর-চোর' এবং 'ডাকাতরানি' স্লোগান দেওয়া হয়। কনভয় আটকে গাড়ি লক্ষ্য করে ছোঁড়া হয় ইট, পাথর, কাদা এবং জুতো। এমনকি গাড়ির কাচে কাদা লেপে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ।
স্থানীয়দের দাবি, বীজপুর ও হালিশহরে গত ১৫ বছর ধরে একাধিক অশান্তির ঘটনা ঘটলেও তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কখনো সেখানে যাননি। তাঁদের অভিযোগ, শান্ত এলাকাকে রাজনৈতিক স্বার্থে অশান্ত ও উত্তপ্ত করতেই মমতা সেখানে হাজির হয়েছেন। চরম উত্তেজনা ও পুলিশি ঘেরাটোপের মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মৃত তৃণমূলকর্মীর বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছালেও নিহতের স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। তিনি কেবল বিরজুর দাদার সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলে বাড়ির বাইর থেকেই ফিরে আসতে বাধ্য হন।
নিহতের দাদা স্পষ্ট জানান, "আমরা ওনাকে হাতজোড় করে বলেছি, বিচার পাওয়ার জন্য আমরা স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারের ওপরই ভরসা রাখছি। এই মুহূর্তে অন্য কারও সাহায্য বা রাজনীতি আমাদের কাম্য নয়।"
এদিনে ঘটনা সম্পর্কে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, "আমার তো মাথা ফেটে যেত! আমরা সবাই মরে যেতাম! পুলিশের সামনে এমন হামলা আমরা আগে কখনও দেখিনি। পুলিশ নিষ্ক্রিয় থেকে বিজেপিকে সুরক্ষা দিচ্ছে। বিজেপি লুম্পেন বাহিনী নিয়ে এসে আমাদের গাড়িতে বড় বড় পাথর মেরেছে। স্থানীয় বিধায়ক নিজে এসে পরিবারকে ঘর থেকে বেরোতে বারণ করেছেন যাতে তারা আমার সঙ্গে দেখা না করে। আমরা এই ঘটনায় কেস করব।"
সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, "যে স্থানীয় আইসি মূল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত, তিনিই উদ্যোগ নিয়ে বাইরে থেকে বিজেপির লোকজনকে জোগাড় করেছেন। পুরো গাড়িতে ইট মারতে মারতেই আমাদের ধাওয়া করা হয়েছে।" বিজেপি মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার এদিনের ঘটনা সম্পর্কে বলেন, "এটা ওনার নিজস্ব কর্মফল। অগণতান্ত্রিক প্রতিবাদের বিরোধিতা করলেও বলব, তিনি এখন বাংলার মানুষের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত। সংবাদ শিরোনামে আসার জন্য তাঁর দলের ভেতরের লোকজনের পরিকল্পনাতেও এমনটা ঘটে থাকতে পারে।"








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন