Breaking

Post Top Ad

Your Ad Spot

বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬

যোগ্য ও প্রকৃত প্রতিনিধিদের মনোনয়নে স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ ফিজিওথেরাপিস্টদের

 ‌

Physiotherapy-professional

সমকালীন প্রতিবেদন : কেন্দ্রীয় সরকারের ‘ন্যাশনাল কমিশন ফর অ্যালাইড অ্যান্ড হেলথকেয়ার প্রফেশনস’ (NCAHP) অ্যাক্ট, ২০২১-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবিতে ২০২৩ সালে পূর্ববর্তী সরকারের আমলে গঠিত স্টেট অ্যালাইড অ্যান্ড হেলথকেয়ার কাউন্সিলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন পশ্চিমবঙ্গের ফিজিওথেরাপি পেশাজীবীরা। একই সঙ্গে তাঁরা আশা প্রকাশ করেছেন যে, বর্তমান সরকার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে পর্যালোচনা করে জাতীয় আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। তাঁদের মূল অভিযোগ, জাতীয় আইনের বিধান অনুসরণ না করে গঠিত এই কাউন্সিলে ফিজিওথেরাপি পেশার যোগ্য ও প্রকৃত প্রতিনিধিদের যথাযথ স্থান দেওয়া হয়নি এবং সদস্য মনোনয়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়নি।

ফিজিওথেরাপিস্টদের দাবি, ওড়িশা-সহ একাধিক রাজ্যে কাউন্সিল গঠনের আগে প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে যোগ্য প্রার্থীদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করা হলেও পশ্চিমবঙ্গে সেই ধরনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে বহু যোগ্য ফিজিওথেরাপি পেশাজীবী মনোনয়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। NCAHP Act, 2021 অনুযায়ী ফিজিওথেরাপি একটি স্বতন্ত্র Allied Healthcare Profession হিসেবে স্বীকৃত। অথচ ১৭ মার্চ ২০২৩ তারিখে গঠিত স্টেট কাউন্সিলে আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট পেশার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

পেশাজীবীদের মতে, NCAHP Act-এর ধারা ২২(৩)(ই)-এর মূল উদ্দেশ্যই হল প্রতিটি স্বীকৃত Allied and Healthcare Profession-এর যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান কাউন্সিলের গঠন সেই উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁদের বক্তব্য, “পূর্ববর্তী সরকারের তরফে দাবি করা হয়েছিল যে যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যায়নি। কিন্তু বাস্তবে কাউন্সিলে সদস্য মনোনয়নের জন্য কোনো উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়নি। যোগ্য প্রার্থীদের আবেদন করার সুযোগ না দিয়ে অন্য ক্ষেত্রের ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আমরা জাতীয় আইন অনুযায়ী কাউন্সিল পুনর্গঠনের দাবি জানাচ্ছি।”

বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল অ্যালাইড মেডিক্যাল অ্যান্ড প্যারামেডিক্যাল কাউন্সিল অ্যাক্ট, ২০১৫’ এবং কেন্দ্রীয় ‘NCAHP Act, 2021’— এই দুটি সমান্তরাল নিয়ন্ত্রক কাঠামো কার্যকর রয়েছে। পেশাজীবীদের মতে, একই ক্ষেত্রে দুটি পৃথক আইন কার্যকর থাকায় প্রশাসনিক ও নীতিগত জটিলতা সৃষ্টি হচ্ছে। তাই তাঁরা কেন্দ্রীয় আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি একক নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন।

এছাড়াও তাঁদের অভিযোগ, NCAHP Act, 2021 অনুযায়ী ফিজিওথেরাপি পেশায় প্রবেশের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা Bachelor of Physiotherapy (BPT) হলেও পশ্চিমবঙ্গে সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে এখনও Diploma in Physiotherapy (DPT) ভিত্তিক নিয়োগ কাঠামো বহাল রয়েছে। এর ফলে জাতীয় মানদণ্ডের সঙ্গে রাজ্যের ব্যবস্থার একটি অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে বলে তাঁদের দাবি। এই বৈষম্য দূর করতে তাঁরা একটি ১০ দফা দাবি সনদ পেশ করেছেন।

ফিজিওথেরাপি পেশাজীবীদের ১০ দফা প্রধান দাবি হল—

১. জাতীয় মানদণ্ড অনুযায়ী রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও ফিজিওথেরাপি পরিষেবা কাঠামোকে আধুনিক ও যুগোপযোগীভাবে পুনর্গঠন করা।

২. NCAHP Act, 2021-এর ধারা ২২(৩)(ই) অনুসারে যোগ্য ও প্রকৃত ফিজিওথেরাপি প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে স্টেট অ্যালাইড অ্যান্ড হেলথকেয়ার কাউন্সিল পুনর্গঠন করা।

৩. পশ্চিমবঙ্গ অ্যালাইড মেডিক্যাল অ্যান্ড প্যারামেডিক্যাল কাউন্সিল আইন, ২০১৫ রদ করে NCAHP Act, 2021-এর অধীনে একক নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গঠন করা।

৪. সরকারি নিয়োগে BPT-কে ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে নিয়োগবিধি সংশোধন এবং শূন্যপদ দ্রুত পূরণ করা।

৫. রাজ্যের সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে DPT কোর্স বন্ধ করে তার পরিবর্তে NCAHP Act, 2021-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ Bachelor of Physiotherapy (BPT) কোর্স চালু করা।

৬. NCAHP-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, স্বীকৃতি ও নিয়োগ নীতি সংশোধন ও বাস্তবায়ন করা।

৭. ফিজিওথেরাপি ক্যাডারে Junior Physiotherapist, Senior Physiotherapist, Chief Physiotherapist এবং Superintendent of Physiotherapy Services-এর মতো সুসংহত পদোন্নতি কাঠামো প্রবর্তন করা।

৮. উচ্চশিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা, দায়িত্ব ও জাতীয় মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্মানজনক বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা।

৯. জেলা হাসপাতাল, মহকুমা হাসপাতাল এবং প্রতিটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে পর্যাপ্ত সংখ্যক ফিজিওথেরাপিস্ট ও বিশেষজ্ঞ পদ সৃষ্টি ও পূরণ করা।

১০. ফিজিওথেরাপিকে অন্য কোনো বিভাগের অধীনস্থ না রেখে একটি স্বাধীন Allied Healthcare Profession হিসেবে পূর্ণ প্রশাসনিক, পেশাগত ও নিয়ন্ত্রক স্বীকৃতি প্রদান করা।

ফিজিওথেরাপি ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সংগঠনের সহ-সভাপতি অরুণ বিশ্বাস বলেন, “আমাদের দাবি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার জন্য নয়; এটি জাতীয় আইন, পেশাগত মানদণ্ড এবং রোগীস্বার্থ রক্ষার দাবি। NCAHP Act, 2021 কার্যকর হওয়ার পরও পশ্চিমবঙ্গে তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ায় ফিজিওথেরাপি পেশাজীবীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। ২০২৩ সালে গঠিত স্টেট কাউন্সিলের কাঠামো ও সদস্য মনোনয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে আমাদের গুরুতর আপত্তি রয়েছে। আমরা মনে করি, সেই সময়ে জাতীয় আইনের বিধান এবং স্বচ্ছ মনোনয়ন প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। তাই আমরা বর্তমান সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছি, বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে পুনর্বিবেচনা করে NCAHP Act, 2021-এর আলোকে কাউন্সিলের গঠন, প্রতিনিধিত্ব এবং কার্যপ্রণালী পর্যালোচনা করা হোক। আমরা চাই রাজ্য সরকার জাতীয় আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাউন্সিল পুনর্গঠন করুক, নিয়োগবিধি সংশোধন করুক এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্বার্থে ফিজিওথেরাপি পেশাকে তার প্রাপ্য মর্যাদা ও স্বীকৃতি প্রদান করুক।”

আন্দোলনকারীদের মতে, এই লড়াই শুধু পেশাগত স্বীকৃতি বা কর্মসংস্থানের নয়; এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে জনস্বাস্থ্য এবং রোগী সুরক্ষার বিষয়। তাঁদের দাবি, রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে ফিজিওথেরাপির নামে ভুয়ো চর্চা এবং অনিয়ন্ত্রিত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার বিস্তার ঘটেছে। পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও নিবন্ধন ব্যবস্থা না থাকায় বহু অযোগ্য ব্যক্তি কোনো স্বীকৃত ডিগ্রি ছাড়াই ফিজিওথেরাপি পরিষেবা প্রদান করছেন এবং বহু অননুমোদিত প্রতিষ্ঠান ফিজিওথেরাপি শিক্ষার নামে কোর্স পরিচালনা করছে। এর ফলে রোগীরা সঠিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসন পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। ফিজিওথেরাপি পেশাজীবীদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে NCAHP Act, 2021-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষা, নিবন্ধন, পেশাগত মানদণ্ড এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হবে। এর ফলে ভুয়ো ফিজিওথেরাপি চর্চা ও অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হবে, রোগী সুরক্ষা আরও শক্তিশালী হবে এবং রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় মানসম্মত পুনর্বাসন পরিষেবা নিশ্চিত করা যাবে। সংগঠনগুলো আশা প্রকাশ করেছে যে, বর্তমান সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে জাতীয় মানদণ্ডের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, যাতে রোগী পরিষেবা এবং রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত হয়।‌‌

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন