সমকালীন প্রতিবেদন : ৮ জুলাই, ২০২৬। জীবনের বাইশ গজে ৫৪ বছর বয়সে পা দিলেন ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক তথা কিংবদন্তি ক্রিকেটার সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। আর এই বিশেষ দিনেই তাঁর মুকুটে জুড়ল এক অনন্য আন্তর্জাতিক পালক। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা আইসিসি-র ‘হল অফ ফেম’-এ অন্তর্ভুক্ত হতে চলেছেন বাঙালির প্রিয় ‘দাদা’।
সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় নিজেই এটিকে তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা জন্মদিনের উপহার হিসেবে দেখছেন। জানা গিয়েছে, আইসিসির বর্তমান চেয়ারম্যান জয় শাহের কার্যকালেই এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে চূড়ান্ত সিলমোহর পড়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই সৌরভকে এই সম্মানের কথা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগামী ১১ জুলাই বার্ষিক সম্মেলনের শেষে আইসিসি এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করবে।
পুরুষ ক্রিকেটার হিসেবে ভারতে দশম এবং সামগ্রিকভাবে দ্বাদশ ভারতীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে এই বিরল সম্মানের অধিকারী হতে চলেছেন সৌরভ। এর আগে ভারত থেকে মহেন্দ্র সিং ধোনি, বীরেন্দ্র সেওয়াগ, বিনু মানকড়, সচিন তেন্ডুলকর, রাহুল দ্রাবিড়, অনিল কুম্বলে, কপিল দেব, সুনীল গাভাসকর এবং বিষেন সিং বেদির মতো কিংবদন্তিরা এই তালিকায় জায়গা পেয়েছেন। এ ছাড়া প্রাক্তন ভারতীয় মহিলা অধিনায়ক ডায়ানা এডুলজিও এই সম্মান পেয়েছেন। এবার তাঁদের পাশেই সগর্বে বসতে চলেছে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের নাম।
একসময় ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে যখন জর্জরিত ও বিপর্যস্ত ছিল ভারতীয় ক্রিকেট, ঠিক তখন ২০০০ সালে দলের অধিনায়কের দায়িত্বভার কাঁধে তুলে নেন সৌরভ। সেই কঠিন সময়ে দাঁড়িয়ে তিনি ভারতীয় ড্রেসিংরুমের আবহ বদলে দেন। নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটারদের ওপর আস্থা রেখে তৈরি করেন বিদেশের মাটিতে চোখে চোখ রেখে লড়াই করার মানসিকতা।
তাঁর নেতৃত্বেই ২০০১ সালে ঘরের মাঠে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ঐতিহাসিক টেস্ট সিরিজ জেতে ভারত। যেখানে দ্বিতীয় টেস্টে ২৭৪ রানে পিছিয়ে থেকেও অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন ঘটিয়েছিল টিম ইন্ডিয়া। এরপর ২০০৩ সালে তাঁরই হাত ধরে ১৯৮৩-র পর প্রথমবার বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছায় ভারত। ৪৯টি টেস্টে নেতৃত্ব দিয়ে ২১টিতে জয় এনে দেন তিনি, যার মধ্যে সিংহভাগ সাফল্যই এসেছিল বিদেশের মাটিতে।
বীরেন্দ্র সেওয়াগকে ওপেনার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা, হরভজন সিংকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা এবং যুবরাজ সিং, মহম্মদ কাইফ বা জাহির খানের মতো তরুণদের দলে এনে ম্যাচ উইনার হিসেবে গড়ে তোলার নেপথ্যে সৌরভের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। পরবর্তীতে ধোনি বা কোহলিরা যে শক্তিশালী ভারতীয় দল পেয়েছিলেন, তার মজবুত ভিত্তিপ্রস্তরটি স্থাপন করেছিলেন মহারাজই।
খেলোয়াড় হিসেবেও সৌরভের পারফরম্যান্স ছিল অতিমানবীয়। অফ-সাইডে তাঁর উইকেটের চারিপাশে চমৎকার শট খেলার দক্ষতার জন্য তাঁকে ‘গড অফ অফ-সাইড’ নামে ডাকা হতো। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর মোট রান সংখ্যা সাড়ে ১৮ হাজারের বেশি। ১১৩টি টেস্ট ম্যাচে ১৬টি শতরান-সহ করেছেন ৭,২১২ রান। ৩১১টি ওয়ানডে ম্যাচে ২২টি শতরান-সহ করেছেন ১১,৩৬৩ রান। ওয়ানডে ক্রিকেটে ভারতের হয়ে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকদের তালিকায় সচিন, বিরাট ও রোহিতের পর তিনি চতুর্থ স্থানে রয়েছেন। শুধু ব্যাট হাতেই নয়, মিডিয়াম পেসার হিসেবে বল হাতেও ভারতের জার্সিতে তিনি মোট ১৩২টি উইকেট শিকার করেছেন।
এবারের জন্মদিনটি সৌরভ ভক্তদের কাছে দ্বিগুণ আনন্দের। একদিকে যেমন আইসিসির এই বড় ঘোষণার খবর সামনে এসেছে, তেমনই অন্য দিকে প্রকাশ পেয়েছে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের বহু প্রতীক্ষিত বায়োপিক বা জীবনীচিত্রের মুক্তির দিনক্ষণ। ২০২৭ সালের ১৪ মে বড় পর্দায় মুক্তি পেতে চলেছে মহারাজের বায়োপিক। সব মিলিয়ে ৫৪ বছরে পা দিয়ে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় প্রমাণ করলেন, মাঠের ক্রিকেটকে বিদায় জানালেও বিশ্ব ক্রিকেটের আঙিনায় তাঁর ‘দাদাগিরি’ আজও অমলিন।









কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন