সমকালীন প্রতিবেদন : ২০১১ থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দফতরে ওঠা একাধিক 'প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি' ও অনিয়মের তদন্তে উচ্চপর্যায়ের কমিশন গঠন করল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নতুন সরকার। কলকাতা হাই কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর নেতৃত্বে এই তদন্ত কমিশন গঠিত হয়েছে। গত ১০ জুলাই নবান্নের পক্ষ থেকে বিজ্ঞপ্তি জারি করে এই সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।
নবান্ন সূত্রে খবর, ২০১১ থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত শিক্ষা, খাদ্য ও জোগান, পুরসভা, পঞ্চায়েত, ত্রাণ ও বিপর্যয় মোকাবিলা, আবাসন এবং মৎস্য দফতরসহ বিভিন্ন সরকারি ক্ষেত্রে যে সমস্ত দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, তা খতিয়ে দেখবে এই কমিশন। স্বরাষ্ট্র দফতর সূত্রে জানা গেছে, সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দুর্নীতি (প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে), আম্পান ত্রাণের টাকা লোপাট, ১০০ দিনের কাজে অনিয়ম, মিড-ডে মিলের আর্থিক তছরুপ, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি সম্পত্তি ও অর্থ আত্মসাৎ এবং স্বাস্থ্যক্ষেত্র ও মেডিক্যাল শিক্ষার দুর্নীতি এই তদন্তের আওতাভুক্ত থাকছে। এর পাশাপাশি, পূর্বতন জমানায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বেআইনি গ্রেফতার, মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো বা পুরসভার নিয়ম ভেঙে বেআইনি নির্মাণে প্রশাসনের কী ভূমিকা ছিল, তাও খতিয়ে দেখবে এই কমিশন।
অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসুর নেতৃত্বাধীন এই কমিশনের তদন্ত বিভাগের দায়িত্বে থাকবেন একজন সিনিয়র আইপিএস অফিসার। প্রশাসনিক শাখা পরিচালনার দায়িত্ব সামলাবেন একজন আইএএস বা ডব্লিউবিসিএস পদমর্যাদার অফিসার। কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তার জন্য পশ্চিমবঙ্গ রেভিনিউ সার্ভিস (ডব্লিউবিআরএস)-এর একজন আধিকারিককে রাখা হচ্ছে। প্রয়োজনে সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে আরও সদস্য নিয়োগ করতে পারবে কমিশন।
আইনি ক্ষমতাবলে এই কমিশনকে সিভিল কোর্ট বা দেওয়ানি আদালতের সমকক্ষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তদন্তের প্রয়োজনে যেকোনো ব্যক্তিকে তলব করে বয়ান রেকর্ড করা এবং যেকোনো স্থানে বসে তদন্ত প্রক্রিয়া চালানোর অধিকার থাকবে কমিশনের। তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা মিললে সংশ্লিষ্ট পুলিশ প্রশাসনকে এফআইআর দায়ের করার সুপারিশও করতে পারবে এই কমিটি।
তবে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইতিমধ্যেই যে সমস্ত মামলার তদন্ত করছে, সেগুলিতে এই কমিশন হস্তক্ষেপ করবে না। নির্দিষ্ট সময় অন্তর তদন্তের অগ্রগতি রিপোর্ট রাজ্য সরকারের কাছে জমা দিতে হবে। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির উৎস খোঁজার পাশাপাশি, দুর্নীতির মাধ্যমে নয়ছয় হওয়া সরকারি অর্থ কীভাবে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব, সে বিষয়েও রাজ্য সরকারকে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেবে এই কমিশন।
উল্লেখ্য, ক্ষমতা দখলের পর থেকেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে তাঁর সরকার দুর্নীতির প্রশ্নে 'জিরো টলারেন্স' নীতি নিয়ে চলবে। বিধানসভাতেও হুঙ্কার দিয়ে তিনি বলেছিলেন, "অনেকেই ভাবছেন দু-মাস জেলে থেকে আইনি লড়াই করে বেরিয়ে আসবেন। তাদের মনে রাখতে হবে, এবার দুর্নীতিগ্রস্তদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও নিলাম করা হবে।" সেই সুর বজায় রেখেই তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, "হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট, হরিশ মুখার্জি রোড কিংবা আমতলার প্রাসাদোপম বাড়িগুলি অধিগ্রহণ করে কলকাতার উড়ালপুলের নিচে থাকা গৃহহীন মানুষদের থাকার ব্যবস্থা করা হবে।" নবান্নের এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপ মুখ্যমন্ত্রীর সেই কড়া বার্তারই বাস্তবায়ন বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন