Breaking

Post Top Ad

Your Ad Spot

সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬

নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে একগুচ্ছ জনমোহিনী ঘোষণা ও পরিকাঠামোয় বিপুল বরাদ্দে বাংলার ভোলবদলের ব্লু-প্রিন্ট

WB-Budget-2026

সমকালীন প্রতিবেদন : দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশক পর বঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার। ১৫ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে রাজ্যে ঘটা রাজনৈতিক পালাবদলের পর, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের প্রথম রাজ্য বাজেট পেশ করলেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। প্রথম বছরের এই বাজেটেই স্পষ্ট ডবল ইঞ্জিন সরকারের সুফল। সমাজের প্রায় সমস্ত স্তরের মানুষের কথা মাথায় রেখে একদিকে যেমন একগুচ্ছ জনকল্যাণমুখী ও আর্থিক সহায়তার প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে, তেমনই অন্য দিকে কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় রেখে রাজ্যের পরিকাঠামোগত উন্নয়নের এক অভূতপূর্ব রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে।

বিগত বছরগুলিতে কেন্দ্রের সঙ্গে লাগাতার সংঘাতের জেরে রাজ্যবাসী একাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্প থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। উপরন্তু, কেন্দ্রকে টেক্কা দিতে গিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যয়ে প্রকল্প চালাতে গিয়ে রাজ্যের রাজকোষে টান পড়ছিল, যার ফলে আটকে ছিল রাস্তাঘাট নির্মাণ ও সরকারি কর্মীদের ডিএ-র মতো মৌলিক চাহিদাগুলি। তবে নতুন বাজেটে সেই অচলাবস্থার অবসান ঘটেছে। অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, 'স্কিম ফর স্পেশ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স টু স্টেটস ফর ক্যাপিটাল ইনভেস্টমেন্ট'-এর অধীনে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যের পরিকাঠামো উন্নয়নে সর্বতোভাবে সাহায্য করবে। পাশাপাশি কেন্দ্রের ‘পূর্বোদয়’ প্রকল্পের মাধ্যমে রাজ্যে ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডোর, ম্যানুফ্যাকচারিং হাব ও পর্যটন শিল্পের প্রভূত উন্নতি সাধন করা হবে। যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণে একগুচ্ছ বড় পদক্ষেপ করা হয়েছে।

কেন্দ্রের 'উড়ান' প্রকল্পের আওতায় পুরুলিয়া, বালুরঘাট ও মালদহে নতুন বিমানবন্দর গড়ে তোলা হবে। কোচবিহার বিমানবন্দরের সম্প্রসারণের পাশাপাশি কলকাতা বিমানবন্দরের ওপর চাপ কমাতে কল্যাণীতে একটি সম্পূর্ণ নতুন বিমানবন্দর তৈরি করা হবে। রেল মন্ত্রকের সহযোগিতায় কলকাতার বাইরে এবার শিলিগুড়ি এবং আসানসোল-দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলেও মেট্রো পরিষেবা চালুর প্রাথমিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই উদ্দেশ্যে রাজ্য বাজেটে প্রযুক্তিগত-অর্থনৈতিক সমীক্ষার জন্য বিশেষ অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে।

কালনা ও শান্তিপুরের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের জন্য ভাগীরথী নদীর ওপর ২,২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রধান সেতু নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা এই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও যাতায়াতের ক্ষেত্রে স্থায়ী ও নিরাপদ বদল আনবে। সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ প্রশমন করে এক ধাক্কায় ২০ শতাংশ ডিএ (মহার্ঘ ভাতা) বৃদ্ধির ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। আগামী ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর হতে চলা এই সিদ্ধান্তের পর রাজ্যে মোট ডিএ-র পরিমাণ দাঁড়াবে ৩৮ শতাংশ।

বেকারত্ব দূরীকরণে রাজ্যে ১ লক্ষ শূন্যপদে নতুন নিয়োগের কথা ঘোষণা করা হয়েছে, যার মধ্যে শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী ও ৫০ হাজার অধ্যাপক পদ রয়েছে। এই সমস্ত নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে ৩৩ শতাংশ পদ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য আগামী অক্টোবর ২০২৬ থেকে চালু হচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন ‘ভরসা কর্মসূচি’। ২১ থেকে ৪৫ বছর বয়সি যোগ্য বেকারদের মধ্যে গ্র্যাজুয়েটদের মাসে ৩,০০০ টাকা এবং অন্যদের মাসে ২,০০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হবে। যে সমস্ত পরিবারের মাসিক আয় ১ লক্ষ টাকার কম এবং যারা অন্য কোনও সামাজিক সুরক্ষার সুবিধা পান না, তাঁরাই এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত হবেন।

বাজেটে সমাজের প্রান্তিক ও শ্রমজীবী মানুষের আর্থিক সহায়তায় ঢালাও বরাদ্দ করা হয়েছে। বার্ধক্য ভাতা, বিধবা ভাতা এবং বিশেষভাবে সক্ষমদের মাসিক ভাতা এক লপ্তে ৫০০ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। আশাকর্মী ও অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ তাঁদের মাসিক সাম্মানিক এক ধাক্কায় ৫,০০০ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। সিভিক ভলান্টিয়ার, গ্রিন পুলিশ, ভিলেজ পুলিশ, হোমগার্ড, এনভিএফ কর্মী, প্রাণীবন্ধু ও প্রাণীমিত্রদের পারিশ্রমিক মাসে ২,০০০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। স্টেট ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের চুক্তিভিত্তিক কন্ডাক্টরদের মাসিক পারিশ্রমিক বাড়িয়ে ১৬,০০০ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

উত্তরবঙ্গের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নে সেখানে একটি করে নতুন IIM এবং AIIMS স্থাপনের ঐতিহাসিক ঘোষণা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি আলিপুরদুয়ার, কালিম্পং এবং দক্ষিণ দিনাজপুরে তিনটি নতুন মেডিক্যাল কলেজ গড়ে তোলা হবে। প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে কলকাতা, বসিরহাট, সুন্দরবন, জঙ্গিপুর এবং আরামবাগ– এই পাঁচটি নতুন জেলা এবং গোপীবল্লভপুরে নতুন মহকুমা গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কাঁথিতে তৈরি হবে নতুন পুলিশ জেলা।

আগের সরকারের বিরোধিতার কারণে আটকে থাকা ১০০ দিনের কাজ এবং আবাস যোজনার মতো মেগা প্রকল্পগুলি ডবল ইঞ্জিন সরকারের হাত ধরে পুনরায় গতি পাচ্ছে। ১২৫ দিনের কাজের জন্য নতুন বাজেটে 'জি-রাম-জি' প্রকল্পে ১৪,০০০ কোটি টাকা এবং প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার জন্য ১৩,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এছাড়াও গর্ভবতী মহিলাদের জন্য 'মাতৃবন্দনা' প্রকল্পে এককালীন ২১,০০০ টাকা ও ৬টি পুষ্টি স্কিম চালু হচ্ছে। আদিবাসীদের জন্য 'প্রধানমন্ত্রী অনুসূচিত জাতি অভ্যুদ্বয় যোজনা' এবং চা শ্রমিকদের জন্য 'পিএম চা শ্রমিক প্রোৎসাহন' যোজনা রাজ্যে কার্যকর করা হচ্ছে। 

বিশেষ সুবিধা পাবেন রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকরা। তাঁদের 'এক দেশ-এক রেশন কার্ড' এবং 'আয়ুষ্মান ভারত' কার্ডের আওতায় এনে সম্পূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা হবে। ডবল ইঞ্জিন সরকারের প্রথম বছরের এই সর্বাঙ্গীণ বাজেটকে এক কথায় অভাবনীয় বলে মনে করছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে আশ্বস্ত করেছেন যে, রাজ্যের সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে কেন্দ্র সব রকমভাবে পাশে থাকবে। এই ধারা বজায় থাকলে আগামী পাঁচ বছরে বাংলা পরিকাঠামো ও প্রগতির নিরিখে দেশের অন্যতম শীর্ষ রাজ্যে পরিণত হবে বলে আশা রাখা যায়।‌

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন