সমকালীন প্রতিবেদন : ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে অবশেষে কাটল দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা। দীর্ঘ প্রায় ২১ মাস সম্পূর্ণ বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য ফের পর্যটন বা ট্যুরিস্ট ভিসা চালু করার ঘোষণা করল নয়াদিল্লি। বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকার যমুনা ফিউচার পার্কে অবস্থিত ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে এই বড় সিদ্ধান্তের কথা জানান বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
আগামী রবিবার, ২৮ জুন থেকেই ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট এবং খুলনার ভিসা আবেদন কেন্দ্রগুলি থেকে বাংলাদেশিদের ট্যুরিস্ট ভিসার আবেদন গ্রহণ করার প্রক্রিয়া শুরু হবে। পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য শহরের কেন্দ্রগুলিতেও এই পরিষেবা চালু করা হবে। এর পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে দেওয়া মেডিকেল ভিসা পরিষেবাও আগের মতোই বহাল থাকবে। কূটনৈতিক প্রথা মেনে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা নাগাদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন দীনেশ ত্রিবেদী। রাষ্ট্রপতির কাছে নিজের পরিচয়পত্র পেশ করে রাষ্ট্রদূত হিসেবে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই বড় ঘোষণাটি করলেন তিনি।
সাংবাদিক সম্মেলনে নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, “আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, আমরা ট্যুরিস্ট ভিসার জন্য স্বাভাবিক ভিসা আবেদন কার্যক্রম ফের শুরু করছি। আশা করি, এর ফলে আমাদের দুই সার্বভৌম দেশের জনগণের মধ্যকার সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে।” বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে আসার অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তিনি জানান, আসার পথেই ভিসার জটিলতা নিয়ে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের আরজি তাঁর নজরে এসেছিল। তাই ঢাকায় পৌঁছেই এই জরুরি বিষয়টি নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান এবং শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সে দেশে এক টালমাটাল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হওয়ায় ওই বছরের ৪ আগস্ট থেকেই ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রগুলির কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ২১ ডিসেম্বর থেকে ট্যুরিস্ট ভিসা প্রদান পুরোপুরি স্থগিত রাখে সাউথ ব্লক।
মাঝের এই দীর্ঘ সময়ে কেবল বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসা ও বাণিজ্য ভিসা দেওয়া হচ্ছিল। ফলে ভ্রমণ, আত্মীয়দের সঙ্গে সাক্ষাৎ বা জরুরি প্রয়োজনে ভারতে আসতে চাওয়া হাজার হাজার বাংলাদেশি নাগরিক চরম বিপাকে পড়েছিলেন। দীর্ঘ ২১ মাস পর পর্যটন ভিসার ওপর থেকে এই বিধিনিষেধ উঠে যাওয়ায় স্বভাবতই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন সাধারণ বাংলাদেশিরা।
ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে এর আগে সর্বদা পেশাদার কূটনীতিকদেরই নিয়োগ করে এসেছে নয়াদিল্লি। তবে এবার সেই প্রচলিত ধারা থেকে সম্পূর্ণ সরে এসে দীনেশ ত্রিবেদীর মতো একজন প্রবীণ ও ঝানু রাজনীতিককে বাংলাদেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত করে পাঠানো হয়েছে। প্রণয় বর্মার স্থলাভিষিক্ত হওয়া দীনেশ ত্রিবেদী তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কংগ্রেস, জনতা দল, তৃণমূল এবং বর্তমানে বিজেপির শীর্ষ স্তরে রাজনীতি করেছেন।
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, প্রচলিত রীতির বাইরে গিয়ে একজন হেভিওয়েট রাজনীতিককে ক্যাবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে ঢাকায় পাঠানো এবং দায়িত্ব নিয়েই ট্যুরিস্ট ভিসা চালুর সিদ্ধান্ত– নয়াদিল্লির এক অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও কৌশলগত বড় পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে ভারত স্পষ্ট বার্তা দিল যে তারা প্রতিবেশীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনর্গঠন ও স্বাভাবিক করতে আন্তরিকভাবে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। এখন দেখার, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ঢাকার অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের বাড়ানো এই বন্ধুত্বের হাত কীভাবে গ্রহণ করে।








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন