সমকালীন প্রতিবেদন : জাতীয় রাজনীতিতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে দিল্লিতে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে চলা তীব্র মনোমালিন্য ও ভাঙন। প্রায় প্রতিদিনই পশ্চিমবঙ্গের শাসকদলের ‘বিদ্রোহী’ শিবিরকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন নাটকের জন্ম হচ্ছে। তবে শনিবার রাজধানীর রাজনৈতিক অলিন্দে যা ঘটল, তা একপ্রকার অবিশ্বাস্য। সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে এবার তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ লোকসভা সাংসদের শিবিরে নাম লেখালেন কলকাতা উত্তরের বর্ষীয়ান ও প্রবীণ সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি এতদিন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম প্রধান নির্ভরযোগ্য স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
শনিবার দুপুরে দিল্লিতে পা রেখেই রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে দেন সুদীপবাবু। তৃণমূল সাংসদ শতাব্দী রায়কে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রথমে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে গিয়ে একপ্রস্থ বৈঠক করেন। সেখান থেকে বেরিয়েই তিনি সোজা চলে যান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে দেখা করতে। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রায় আধ ঘণ্টাব্যাপী এই রুদ্ধদ্বার বৈঠক দিল্লির রাজনৈতিক সমীকরণকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। সূত্রের খবর, লোকসভার অধ্যক্ষ বা স্পিকারকে লেখা বিক্ষুব্ধ তৃণমূল সাংসদদের চিঠিতে ইতিমধ্যেই স্বাক্ষর করে দিয়েছেন এই সাতবারের প্রবীণ সাংসদ।
সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ভোলবদল এবং বিদ্রোহী শিবিরে যোগদানের পর ছোটবেলায় পড়া খরগোশ ও কচ্ছপের সেই বিখ্যাত গল্পের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে– যেখানে শেষমুহূর্তে এসে ‘ধীরে চলো’ নীতিতে বাজিমাত হয়। এতদিন মনে করা হচ্ছিল, দলের বিরুদ্ধে প্রথম সরব হওয়া বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বেই দিল্লিতে এগোবে এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী। কিন্তু শেষবেলায় সুদীপবাবুর এন্ট্রি সম্পূর্ণ হিসাব উল্টে দিয়েছে। অভিজ্ঞতার নিরিখে কাকলিকে সরিয়ে লোকসভার তৃণমূলের এই প্রাক্তন দলনেতাই হতে চলেছেন ‘বিদ্রোহী’ সংসদীয় দলের নতুন নেতা। আর সুদীপকে এই শিবিরে টেনে আনার অন্যতম প্রধান কারিগর শতাব্দী রায় পেতে পারেন উপ-দলনেতার পদ।
তৃণমূলের সঙ্গে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পর্ক বহু দশকের। অতীতে চিটফান্ড মামলায় নাম জড়ানোয় তাঁকে বেশ কিছুদিন জেলেও কাটাতে হয়েছিল। তবে জামিনে মুক্ত হয়ে সসম্মানে রাজনীতিতে ফিরে কলকাতা উত্তর কেন্দ্রটি নিজের দখলে রাখেন তিনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে লোকসভার দলনেতা করার পাশাপাশি দিল্লিতে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় সাধনের গুরুদায়িত্বও দিয়েছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক মহলের মতে, সম্প্রতি ‘অসুস্থতার’ অজুহাত দেখিয়ে সুদীপকে সরিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে লোকসভার দলনেতা করায় সুদীপবাবু দিল্লির রাজনীতিতে কোণঠাসা ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলেন। দলনেতার পদ খোয়ানোর এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভই তাঁর দলবদল ও অমিত শাহের দ্বারস্থ হওয়ার প্রধান কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বর্তমানে লোকসভায় তৃণমূলের ২৮ জন সাংসদের মধ্যে ১৯ জনই মমতার হাত ছেড়ে বিক্ষুব্ধ শিবিরে নাম লিখিয়েছেন। এই তালিকায় যেমন শর্মিলা সরকার বা বাপি হালদারের মতো নবাগতরা আছেন, তেমনই আছেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার বা শতাব্দী রায়ের মতো পুরনো চালেরা। সুদীপের মতো অতি-ঘনিষ্ঠ নেতার এই বিদ্রোহ মমতাপন্থী তৃণমূল শিবিরে বড় ধাক্কা। এদিকে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই পদক্ষেপের পর কলকাতায় তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ প্রশ্ন তুলেছেন, স্বামীর দেখাদেখি এবার তাঁর স্ত্রী তথা রাজ্য বিধানসভার বিধায়ক নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়ও রাজ্যে বিক্ষুব্ধ শিবিরে যোগ দেবেন কি না।
সব ঠিক থাকলে, আগামী সোমবার লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে দেখা করতে পারেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন এই ১৯ জন বিদ্রোহী সাংসদ। সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ দিয়ে স্পিকারকে চিঠি সঁপে এনডিএ জোটকে সমর্থনের কথা জানাবেন তাঁরা। একই সঙ্গে সংসদের দুই কক্ষে তাঁদের জন্য পৃথক ব্লকে বসার ব্যবস্থা করার দাবিও জানানো হবে। তবে পুরো বিষয়টি এখন সোমবারের চিঠি এবং স্পিকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে।









কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন