সমকালীন প্রতিবেদন : ক্ষমতা হারানোর পর তীব্র গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, ভাঙনের জল্পনা এবং সাংগঠনিক সংকটের মাঝেই ঘুরে দাঁড়াতে মরিয়া তৃণমূল কংগ্রেস। দলের অন্দরে চলা তীব্র টানাপড়েনের মধ্যে শুক্রবার এক ঐতিহাসিক সাংগঠনিক পুনর্গঠনের পথে হাঁটল ঘাসফুল শিবির। দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সৈনিক সুব্রত বক্সীকে সরিয়ে তৃণমূলের নতুন রাজ্য সভাপতির গুরুদায়িত্ব তুলে দেওয়া হলো চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের হাতে। একই সাথে, সমস্ত ক্ষমতা আর শুধুমাত্র অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাঁধে না রেখে অভিজ্ঞ ও বিভিন্ন স্তরের প্রবীণ নেতৃত্বকে সামনে এনে সংগঠনে এক নতুন ভারসাম্য তৈরির স্পষ্ট বার্তা দিলেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
রাজ্যে প্রশাসনিক ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই তৃণমূলের রাজনৈতিক জমি টলমলে। একের পর এক পুরনিগমের মেয়রদের ইস্তফা এবং দল ভাঙার গুঞ্জনের মধ্যে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে দলের সমস্ত রাজ্য ও শাখা সংগঠন ভেঙে দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই আবহে শুক্রবার কালীঘাটের বাসভবনে এক জরুরি বৈঠক ডাকেন নেত্রী। বৈঠকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিম, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, অসীমা পাত্র, মদন মিত্র, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য ও কুণাল ঘোষদের মতো মূলত ‘আদি’ তথা মমতা অনুগামীদেরই উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে। তবে তাৎপর্যপূর্ণভাবে, ‘বিদ্রোহী’ শিবিরের কোনো বিধায়কই এই বৈঠকে পা বাড়াননি।
সংগঠন বাঁচাতে এদিন সবচেয়ে বড় রদবদলটি করা হয়েছে রাজ্য নেতৃত্বে। প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক– দুই ক্ষেত্রেই দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে দলের রাজ্য সভানেত্রী করা হয়েছে। অন্যদিকে, শ্রমিক সংগঠনে বড় পরিবর্তন এনে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বর্ষীয়ান নেতা মলয় ঘটককে। শিল্পাঞ্চল এবং শ্রমিক মহলে তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কর্মীদের ক্ষোভ প্রশমন করাই এখন মলয়ের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
বড়সড় ওলটপালট হয়েছে ছাত্র সংগঠনেও। প্রবীণদের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করতে তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্যকে সরিয়ে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের নতুন মুখ করা হয়েছে প্রিয়াঙ্কা অধিকারীকে। তবে সায়নী ঘোষের ওপর ভরসা রেখে তাঁকে আপাতত যুব সংগঠনের দায়িত্বেই বহাল রাখা হয়েছে। এছাড়াও, সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যে হকার উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক সামাল দিতে মদন মিত্রকে হকার সংগঠনের সম্পূর্ণ পৃথক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংসদীয় রাজনীতি ও জাতীয় স্তরে দলের অবস্থান শক্তিশালী করতে এ দিন ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং দোলা সেনকে দলের যুগ্ম জাতীয় সাধারণ সম্পাদক পদ দেওয়া হয়েছে। এদিকে, বিধানসভায় দলনেত্রীর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে ‘বিদ্রোহী’ বিধায়কেরা ইতিমধ্যে নিজেদের মতো বিরোধী দলনেতা নির্বাচন করেছেন। এমনকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে শুধুমাত্র ‘পরামর্শদাতা’ হিসেবে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন পরিষদীয় দলের বিদ্রোহী নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। খোদ সংসদীয় দলেও শুরু হয়েছে ‘খেলা ভাঙার খেলা’।
‘বিদ্রোহী’দের একাংশ যদি আজকের বৈঠকে আসতেন, তবে হয়তো সংখ্যাধিক্যের জোরে বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঋতব্রত ও সন্দীপনদের বিধানসভা থেকে সরানোর আইনি লড়াই লড়তে পারতেন মমতা। কিন্তু বিদ্রোহীদের থেকে কোনো সাড়া না মেলায় তৃণমূলের সংসদীয় দল বাঁচানোর যুদ্ধ আরও কঠিন হয়ে পড়ল। শেষ পর্যন্ত কি জোড়াফুল প্রতীক নিজের কাছে ধরে রাখতে পারবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়? উত্তর এখন সময়ের গর্ভে।
ক্ষমতা হারানোর পর সংগঠনকে নতুনভাবে গুছিয়ে তোলা এবং কর্মীদের মধ্যে আস্থা ফেরানোর লক্ষ্যেই তৃণমূলের এই প্রথম বড় পদক্ষেপ। আগামী দিনে এই নতুন নেতৃত্বের ভারসাম্য দলটিকে কতটা ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে বাংলার রাজনৈতিক মহল।








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন