সমকালীন প্রতিবেদন : রাজ্যের স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থায় বড়সড় পুনর্বিন্যাসের সম্ভাবনা। দীর্ঘদিন ধরে পড়ুয়াশূন্য হয়ে থাকা রাজ্যের ৯৩৩টি প্রাথমিক, উচ্চ প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে এবার পর্যালোচনা শুরু করেছে স্কুল শিক্ষা দফতর। কোথাও গত পাঁচ বছর ধরে, আবার কোনও কোনও ক্ষেত্রে প্রায় দুই দশক ধরে একজন পড়ুয়াও ভর্তি হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অব্যবহৃত হয়ে থাকা এই স্কুলগুলির জমি, ভবন এবং খেলার মাঠ কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
স্কুল শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মণ জানিয়েছেন, ছাত্রশূন্য হয়ে পড়া বিদ্যালয়গুলির পরিকাঠামো ও সম্পত্তি নিয়ে পরিকল্পিতভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে স্কুলগুলিকে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার কোনও সিদ্ধান্ত আপাতত নেই। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত কোনও বিদ্যালয়কে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি মডেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এমনকি পিপিপি ব্যবস্থায় দেওয়ার জন্য কোনও নির্দিষ্ট স্কুলকেও চিহ্নিত করা হয়নি।
দীর্ঘদিন পড়ুয়া না থাকায় রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে এমন বেশ কিছু বিদ্যালয় রয়েছে, যেগুলির ভবন, জমি এবং খেলার মাঠ কার্যত ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কোথাও স্কুলের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গিয়েছে বহু বছর আগে, আবার কোথাও দীর্ঘদিন ধরে নতুন করে কোনও পড়ুয়া ভর্তি না হওয়ায় পরিকাঠামো থাকা সত্ত্বেও তার ব্যবহার হচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে সরকারি সম্পত্তিগুলিকে ভবিষ্যতে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়েই মূলত পর্যালোচনা চালানো হচ্ছে।
স্কুল শিক্ষা দফতরের অধীনে থাকা ওই জমি ও ভবন অন্য কোনও সরকারি দফতরের কাজে ব্যবহার করা যায় কি না, সেই সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী এক দফতরের অধীনে থাকা অব্যবহৃত সম্পত্তি অন্য কোনও সরকারি দফতরকে ব্যবহারের জন্য হস্তান্তর করা সম্ভব কি না, সেই বিষয়টিও আলোচনার মধ্যে রয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিস্থিতি এবং স্কুলগুলির প্রয়োজনীয়তা খতিয়ে দেখা হবে বলে জানা গিয়েছে।
তবে কোনও বিদ্যালয়ে পড়ুয়ার সংখ্যা কমে গেলেই সেটি বন্ধ করে দেওয়া হবে না বলে স্পষ্ট করেছেন শিক্ষামন্ত্রী। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকা, কম জনবসতিপূর্ণ অঞ্চল কিংবা এমন জায়গা যেখানে কাছাকাছি বিকল্প কোনও বিদ্যালয় নেই, সেখানে কম ছাত্রছাত্রী থাকলেও স্কুল চালু রাখার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। অর্থাৎ শুধু পড়ুয়ার সংখ্যা কম, এই একটি কারণকে ভিত্তি করে স্কুল বন্ধ করার পরিকল্পনা নেই।
অন্যদিকে, একই এলাকায় পাশাপাশি একাধিক স্কুল থাকলে পরিস্থিতি নতুন করে পর্যালোচনা করা হবে। কোনও একটি বিদ্যালয়ে পড়ুয়ার চাপ বেশি, অথচ তার কাছাকাছি অন্য কোনও বিদ্যালয়ে ছাত্রসংখ্যা অত্যন্ত কম বা একেবারেই নেই– এমন ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট স্কুলগুলির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে কোথাও ছাত্রসংখ্যার চাপ কমানো এবং কোথাও অব্যবহৃত পরিকাঠামোকে কার্যকরভাবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
স্কুলগুলির পরিকাঠামোর পাশাপাশি শিক্ষক ঘাটতির বিষয়টিও সরকারের পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্তমানে রাজ্যে শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। স্কুল শিক্ষামন্ত্রীর দাবি, চলতি এসএসসি নিয়োগ প্রক্রিয়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হলে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে রাজ্যের প্রতিটি বিদ্যালয়ে শিক্ষক থাকার লক্ষ্যে এগোনো যাবে।
তবে এই মুহূর্তেই রাজ্যের সমস্ত স্কুলে প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত শিক্ষক রয়েছে, এমন দাবি করা হচ্ছে না। ২৬ হাজার শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিদ্যালয়ভিত্তিক প্রয়োজনের হিসাব অনুযায়ী এসএসসির মাধ্যমে আরও শিক্ষক নিয়োগ করে ঘাটতি পূরণের পরিকল্পনা রয়েছে স্কুল শিক্ষা দফতরের।
ফলে একদিকে যেমন দীর্ঘদিন ধরে পড়ুয়াশূন্য হয়ে থাকা বিদ্যালয়গুলির জমি, ভবন ও মাঠের ভবিষ্যৎ ব্যবহারের বিষয়ে পর্যালোচনা চলছে, তেমনই অন্যদিকে যে স্কুলগুলিতে পড়ুয়ার চাপ রয়েছে সেখানে শিক্ষক ও পরিকাঠামোর ঘাটতি মেটানোর দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে। আগামী দিনে এই পর্যালোচনার ভিত্তিতে রাজ্যের স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন আসে, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।









কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন