সমকালীন প্রতিবেদন : কলকাতার তারাতলার ব্রেসব্রিজ এলাকায় এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটল। বুধবার দুপুরে কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষের (পোর্ট ট্রাস্ট) জমিতে একটি বেসরকারি চা প্রস্তুতকারক সংস্থার নির্মীয়মাণ পাঁচতলা চায়ের গুদামের তিনতলার ছাদ ঢালাইয়ের সময় তা আচমকা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে। টন টন ওজনের লোহার ভারী বিম ও ছাদের ধ্বংসস্তূপের নিচে মুহূর্তে জীবন্ত চাপা পড়ে যান কর্মরত বহু শ্রমিক।
শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, ঘটনায় অন্তত ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ২১ জনকে উদ্ধার করে গ্রিন করিডোরের মাধ্যমে কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তবে প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে এবং এখনও ধ্বংসস্তূপের ভেতরে অন্তত ১৮ জন শ্রমিক আটকে রয়েছেন। ঘটনার ভয়াবহতা বিবেচনা করে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ শুরু করেছে দমকল, কলকাতা পুলিশ এবং বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে দ্রুত নামানো হয়েছে সেনাবাহিনীকেও।
গ্যাসকাটার দিয়ে বিশাল লোহার বিমগুলি কেটে এবং জেসিবি ও ক্রেন ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ সরানোর আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। অন্ধকার নেমে আসায় উদ্ধারকাজ সচল রাখতে এলাকায় বিকল্প আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং তৈরি হয়েছে অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে আটকে পড়া শ্রমিকদের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে, বাইরে থেকে নাম ধরে ডেকে তাঁদের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করছেন উদ্ধারকারীরা। দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তরের জন্য দুর্ঘটনাস্থলে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে একের পর এক অ্যাম্বুলেন্স।
বিপর্যয়ের খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এছাড়াও পরিস্থিতি পরিদর্শনে যান মন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ, অগ্নিমিত্রা পাল, বিধায়ক রাকেশ সিং এবং পুর কমিশনার স্মিতা পাণ্ডে। সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর নজরদারি চালাতে নবান্নের তরফে একটি বিশেষ আপৎকালীন কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। মন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ জানান, “আমাদের প্রথম লক্ষ্য প্রাণগুলোকে বাঁচানো। দ্রুত গতিতে উদ্ধার কাজ চলছে।”
অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী গভীর শোক প্রকাশ করে এক্স (টুইটার) হ্যান্ডেলে লিখেছেন, “এই ঘটনায় আমি গভীরভাবে মর্মাহত। যে অমূল্য প্রাণগুলি চলে গেল, সেই বেদনা প্রকাশের ভাষা নেই। শোকস্তব্ধ পরিবারগুলির পাশে রাজ্য সরকার সবরকমভাবে থাকবে।” স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সকাল থেকেই এই বিশাল পরিকাঠামোর মূল লোহার কাঠামোটি বিপজ্জনকভাবে দুলছিল। সেই গলদ ‘পরখ’ করতেই দুপুরে বেশ কয়েকজন শ্রমিক কাঠামোটির নিচে জড়ো হলে এই ভয়ংকর দুর্ঘটনা ঘটে।
এই ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন এলাকার বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, তৃণমূল জমানার সিন্ডিকেট রাজ ও কাটমানির কারণেই কোনো অভিজ্ঞতা না থাকা সংস্থাকে এই কাজের বরাত দেওয়া হয়েছিল। অত্যন্ত নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে বেআইনিভাবে এই গুদামটি তৈরি করা হচ্ছিল এবং এ বিষয়ে আগেই বন্দর কর্তৃপক্ষকে জানানো সত্ত্বেও কোনো পদক্ষেপ করা হয়নি। মন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ-ও এই ঘটনায় পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলের দুর্নীতি ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন।
বিকেলে নবান্নে এক জরুরি সাংবাদিক বৈঠক করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী নির্মীয়মাণ ভবনটির কাগজপত্রে বেশ কিছু ত্রুটি মিলেছে, যার তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই দুর্ঘটনার জেরে কলকাতা শহরে সমস্ত ধরনের নির্মীয়মাণ কাজ আগামী ৩১শে জুলাই পর্যন্ত সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এই সময়ের মধ্যে সমস্ত প্রকল্পের জরুরি ভিত্তিতে অডিট করা হবে এবং রিপোর্ট সন্তোষজনক হলে আগামী আগস্ট মাস থেকে পুনরায় কাজ শুরুর অনুমোদন দেওয়া হবে। বর্তমানে বিধানসভার অধিবেশন চলায়, নিহত ও আহতদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি আগামীকাল বিধানসভাতেই চূড়ান্ত করা হবে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানান।









কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন