সমকালীন প্রতিবেদন : রাজ্য রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন আইনি পদক্ষেপ। সোমবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় পাশ হয়ে গেল ‘পশ্চিমবঙ্গ পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অফ অ্যান্টি-সোশাল অ্যাক্টিভিটিজ বিল, ২০২৬’, যা রাজনৈতিক মহলে ‘গুন্ডাদমন বিল’ নামে পরিচিত। বিধানসভায় বিলটি পেশ করেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিশাল লামা। ব্যাপক আলোচনা ও টানটান উত্তেজনার পর এদিন ধ্বনিভোটে প্রস্তাবিত বিলটি পাশ হয়। বিলের পক্ষে ভোট পড়ে ১৭৬টি এবং বিপক্ষে ৪১টি ভোট। তবে ‘কালীঘাট তৃণমূল’ শিবির সহ মোট ২০ জন বিধায়ক ভোটদান থেকে বিরত ছিলেন।
বিগত তৃণমূল জমানায় রাজ্যজুড়ে তোলাবাজি, সিন্ডিকেট রাজ, জমি দখল ও নানাবিধ দুর্নীতির পাহাড়প্রমাণ অভিযোগ উঠেছিল। বহু নেতার বিপুল সম্পত্তি, রাজকীয় বাড়ি, তাল তাল সোনা ও ব্যাঙ্কে কোটি কোটি টাকার হদিস পেয়েছে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য তদন্তকারী সংস্থাগুলি। সাধারণ মানুষের ক্ষোভের এই আবহে রাজ্যে আইনের শাসন কায়েম করতে এবং সমাজবিরোধীদের দমনে এই নতুন বিলকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ‘দাওয়াই’ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
কেন এই কঠোর আইনের প্রয়োজন, তার সপক্ষে বলতে গিয়ে বিধানসভায় পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলের তীব্র সমালোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। অতীতে সিএএ বিরোধী আন্দোলনের নামে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে রেল লাইন উপড়ানো, সরকারি বাসে আগুন, স্টেশন ভাঙচুর এবং মালদহের মোথাবড়িতে বেছে বেছে দোকানে অগ্নিসংযোগের খতিয়ান তুলে ধরেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “এই আইনের আওতায় অপরাধীদের শুধু জেলেই পাঠানো হবে না, তাঁদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ক্ষয়ক্ষতির দ্বিগুণ দৃষ্টান্তমূলক ক্ষতিপূরণ উসুল করা হবে। বিরোধ করতে হলে ইন্ডি-রাজ্যে যান, বাংলায় এসব চলবে না।”
বিলটিকে স্বাগত জানিয়ে পর্যটনমন্ত্রী শংকর ঘোষ বলেন, “যাঁরা গরিবের টাকা শোষণ করার চেষ্টা করবেন, তাঁদের শাস্তির জন্য এই বিল জরুরি। এর মাধ্যমে পুলিশকে টেবিলের তলা থেকে বের করে গুন্ডাদের টেবিলের তলায় ঢোকানোর সময় এসেছে।” এই বক্তব্যের পর তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় বিলের বিরোধিতা করতে উঠলে কক্ষ জুড়ে তুমুল হট্টগোল শুরু হয়, যার জেরে তিনি বক্তব্য শেষ করতে পারেননি।
অন্যদিকে, পুর মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল গত সরকারের ভোট-পরবর্তী হিংসার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “উস্কানিমূলক মন্তব্য করলেও তা এই আইনের আওতায় আসবে। আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি ও কুনাল ঘোষেরা এই বিলের তীব্র বিরোধিতা করে এটি ‘সিক্রেট কমিটি’র কাছে পাঠানোর আবেদন জানান। নওশাদ প্রশ্ন তোলেন, “বিলে সন্দেহের ভিত্তিতে গ্রেপ্তারের যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তার অপপ্রয়োগ করে বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করা হবে না তো? নির্দোষরা যেন ভুক্তভোগী না হয়।”
বিলের খসড়া অনুযায়ী, সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক বা নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করতে পারে এমন সব কাজই ‘সমাজবিরোধী’ বলে গণ্য হবে। শৃঙ্খলা নষ্ট, জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতি, আইনসম্মত ব্যবসা-বাণিজ্যে বাধা, বেআইনি জমি বা সম্পত্তি দখল, সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর, এবং বেআইনি বালি, পাথর বা খনি কারবার ও বনজ সম্পদের ক্ষতি—সবকিছুই এই আইনের আওতাভুক্ত করা হয়েছে। সমাজবিরোধীদের দমনে পুলিশ ও তদন্তকারী সংস্থাকে এই বিলে বিপুল ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অবসান ঘটতে চলেছে সিন্ডিকেট ও তোলাবাজি রাজের।









কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন