সমকালীন প্রতিবেদন : রাজ্যে পালাবদলের পর প্রশাসনিক গতি বাড়াতে বড়সড় পদক্ষেপ করল নতুন সরকার। সোমবার নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পৌরোহিত্যে নবগঠিত মন্ত্রিসভার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি সম্পন্ন হয়। এদিনের বৈঠকে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ‘সপ্তম রাজ্য বেতন কমিশন’ গঠনের প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে ক্যাবিনেট। একই সঙ্গে মহিলাদের জন্য সরকারি বাসে বিনামূল্যে যাতায়াত এবং আগামী ১ জুন থেকে ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ প্রকল্প চালু করার মতো একাধিক জনমুখী ও তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
সোমবারের এই হাইপ্রোফাইল বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন দিলীপ ঘোষ, নিশীথ প্রামাণিক, অগ্নিমিত্রা পাল, ক্ষুদিরাম টুডু এবং অশোক কীর্তনিয়ার মতো ক্যাবিনেট মন্ত্রীরা। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজকুমার আগরওয়াল সহ বিভিন্ন দপ্তরের পদস্থ সচিবরা। প্রশাসনকে আরও সক্রিয় করতে এখন থেকে প্রতি ১৫ দিন অন্তর অন্তর ক্যাবিনেট বৈঠক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নতুন মন্ত্রিপরিষদ।
বৈঠক শেষে নবান্নে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন নারী, শিশু ও সমাজকল্যাণ এবং পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। তিনি জানান, “রাজ্যের সরকারি কর্মচারী, বিধিবদ্ধ সংস্থা, বোর্ড, নিগম, স্থানীয় সংস্থা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন কাঠামো সংশোধনের লক্ষ্যে সপ্তম রাজ্য বেতন কমিশন গঠন করা হবে। খুব শীঘ্রই এই সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি বা নোটিফিকেশন জারি করা হবে।”
তবে রাজ্য সরকারি কর্মীদের বহুল চর্চিত মহার্ঘ ভাতা বা ডিএ প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, এদিনের ক্যাবিনেট মিটিংয়ের মূল এজেন্ডায় ডিএ-র বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ফলে তা নিয়ে সোমবার কোনো আলোচনা হয়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে সরকার যে ইতিবাচক, তা স্পষ্ট করে মন্ত্রী বলেন, “ডিএ নিয়ে আজ আলোচনা না হলেও আগামী দিনে অবশ্যই আলোচনা হবে। সমস্ত বিষয় ধীরে ধীরে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
এই সিদ্ধান্তের পর ডিএ আন্দোলনকারী সংগঠন ‘সংগ্রামী যৌথ মঞ্চ’-এর সদস্যরা সপ্তম বেতন কমিশন গঠনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ‘সরকারি কর্মচারী পরিষদ’-এর সভাপতি দেবাশিস শীল কর্মীদের আশ্বস্ত করে বলেন, “আমরা মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখছি। শিক্ষক, কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই। নতুন সরকার ডিএ নিয়ে শীঘ্রই সদর্থক ও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে।”
প্রাক্তন সরকারের কোনো সামাজিক প্রকল্প যে বন্ধ করা হবে না, তা আগেই স্পষ্ট করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। এদিন মহিলাদের আর্থিক সহায়তার প্রকল্প ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ নিয়ে অবস্থান আরও পরিষ্কার করলেন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। তিনি ঘোষণা করেন, আগামী ১ জুন থেকেই এই প্রকল্প চালু করার জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এর জন্য দ্রুত একটি নতুন পোর্টাল চালু করা হচ্ছে।
কারা পাবেন এই সুবিধা? মন্ত্রী জানান, যাঁরা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ-র জন্য আবেদন করেছেন, তাঁরাও এই অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের সুবিধা পাবেন। এমনকি যাঁরা ট্রাইবুনালে আবেদন জানিয়েছেন, তাঁরাও এর আওতাভুক্ত হবেন। তবে কোনো স্কলারশিপ প্রোগ্রাম বন্ধ হচ্ছে না এবং সম্পত্তি কর বাড়ানো বা কমানো হচ্ছে না বলেও তিনি স্পষ্ট করে দেন।
এদিনের মন্ত্রিসভার বৈঠকে একটি অত্যন্ত বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী মাস থেকে রাজ্যে ধর্মের ভিত্তিতে শ্রেণী বিন্যাসের মাধ্যমে পরিচালিত যাবতীয় সরকারি প্রকল্প সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে রাজ্যের সমস্ত সরকারি বাসে মহিলাদের বিনামূল্যে যাতায়াতের নীতিগত প্রস্তাবেও চূড়ান্ত সিলমোহর দিয়েছে ক্যাবিনেট। পাশাপাশি, পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী জানান, রাজ্যের সমস্ত পুর এলাকায় নোংরা-আবর্জনা পরিষ্কার এবং স্ট্রিট লাইট লাগানোর কাজ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
সূত্রের খবর, এদিনের বৈঠকে আরজি কর হাসপাতালের তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়েও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। গত সপ্তাহেই মুখ্যমন্ত্রী হাসপাতালের দালালচক্র ও অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট নিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় এদিন চিকিৎসক ও বিধায়কদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকও চলে। হাসপাতালের ‘দালাল-রাজ’ এবং ‘অ্যাম্বুলেন্সের কালোবাজারি চক্র’ পুরোপুরি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে প্রশাসন অত্যন্ত বড় এবং কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে বলে নবান্ন সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে।









কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন