সমকালীন প্রতিবেদন : আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় এবার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বড় সিদ্ধান্ত নিল কলকাতা হাই কোর্ট। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই-এর বিগত দিনের তদন্তের শ্লথ গতি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশের পাশাপাশি, এবার সিবিআই-এর পূর্বাঞ্চলীয় যুগ্ম-অধিকর্তার নেতৃত্বে ৩ সদস্যের একটি নতুন বিশেষ তদন্তকারী দল বা ‘সিট’ গঠনের নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এই সিট গঠন করতে হবে।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট আর জি কর হাসপাতালের সেমিনার রুমে তরুণী চিকিৎসককে নৃশংসভাবে ধর্ষণ ও খুন করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে নেমে কলকাতা পুলিশ সঞ্জয় রায় নামে এক সিভিক ভলান্টিয়ারকে গ্রেপ্তার করে। পরে উচ্চ আদালতের নির্দেশে তদন্তভার হাতে নেয় সিবিআই। সম্প্রতি শিয়ালদা আদালত ধৃত সঞ্জয় রায়কে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা দিলেও, এই তদন্তে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট হতে পারেননি অভয়ার বাবা-মা। তাঁদের দাবি ছিল, এই ঘটনার নেপথ্যে আরও অনেকেই জড়িত যারা এখনও আড়ালে রয়ে গেছে।
ইতিমধ্যে এ রাজ্যে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। ভোটের আগে বিজেপির তরফে বারবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে তারা ক্ষমতায় এলে আর জি কর মামলার নতুন করে তদন্ত করাবে। সুবিচারের আশায় নির্যাতিতার মা রত্না দেবনাথ স্বয়ং পানিহাটি কেন্দ্র থেকে বিজেপির টিকিটে নির্বাচন লড়েন। রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ক্ষমতা এসেই আর জি করের ফাইল নতুন করে খোলার নির্দেশ দেন।
ইতিমধ্যেই তৎকালীন পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েল, তৎকালীন ডিসি সেন্ট্রাল ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এবং তৎকালীন ডিসি নর্থ অভিষেক গুপ্তাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। ঘটনার সময় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বা কোনও মন্ত্রী ফোনে বা মেসেজে কোনও বিশেষ নির্দেশ দিয়েছিলেন কিনা, তাও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। এই আবহে সম্প্রতি বিচারপতি রাজাশেখর মান্থা ব্যক্তিগত কারণে মামলা থেকে সরে দাঁড়ালে, প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের নির্দেশে বিচারপতি শম্পা সরকার এবং বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের নতুন ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলার শুনানি শুরু হয়।
এদিন শুনানির শুরুতেই ক্ষুব্ধ আদালত সিবিআই-কে কড়া ভর্ৎসনা করে প্রশ্ন তোলে, “২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর ২৪ পাতার প্রাথমিক চার্জশিট দাখিলের পর, বিগত ১ বছর ৭ মাস ধরে সিবিআই আসলে কী তদন্ত করল?” এর জবাবে সিবিআই-এর আইনজীবীরা জানান যে তদন্ত থমকে নেই, এই সময়ে ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে।
উচ্চ আদালত স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে, সত্য উদ্ঘাটন এবং বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের শিকড়ে পৌঁছতে সিবিআই-কে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হচ্ছে। ঘটনার রাতে সহকর্মীদের সাথে নির্যাতিতার রাতের খাবার খাওয়া থেকে শুরু করে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত– মাঝের এই দীর্ঘ সময়ে ঠিক কী কী ঘটেছিল এবং কারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ ‘টাইমলাইন’ ও অখণ্ড ঘটনাক্রম নতুন গঠিত ৩ সদস্যের সিট-কে সুনির্দিষ্টভাবে খতিয়ে দেখতে হবে।
মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী ২৫ জুন, এবং ওইদিনই নবগঠিত সিট-কে তাদের অগ্রগতির তদন্ত রিপোর্ট সরাসরি হাই কোর্টে জমা দিতে হবে। এখন দেখার, উচ্চ আদালতের এই কড়া পদক্ষেপের পর নতুন সিট এই মামলার জল কতদূর নিয়ে যায়।








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন