সমকালীন প্রতিবেদন : ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের ১৯তম মরসুম যখন মধ্যগগনে, ঠিক তখনই টুর্নামেন্টের নিরাপত্তা ও সংহতি রক্ষায় নজিরবিহীন পদক্ষেপ করল ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই)। খেলোয়াড় ও সাপোর্ট স্টাফদের ‘হানি ট্র্যাপ’-এর ফাঁদ থেকে বাঁচাতে দশটি ফ্র্যাঞ্চাইজিকেই কড়া ভাষায় চিঠি পাঠিয়ে সতর্ক করেছেন বোর্ড সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া। সম্প্রতি বিসিসিআই-এর পক্ষ থেকে আট পাতার একটি বিস্তারিত নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে, যেখানে নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রোটোকল লঙ্ঘনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
তদন্তকারী সংস্থা ও গোয়েন্দা মহলে ‘হানি ট্র্যাপ’ একটি অতি পরিচিত শব্দ। এটি মূলত এক ধরনের প্রতারণা বা ব্ল্যাকমেল করার কৌশল। এক্ষেত্রে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা খেলোয়াড়কে টার্গেট করে প্রেম বা শারীরিক আকর্ষণের প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলা হয়। এরপর সেই ব্যক্তির ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে তাঁকে ব্ল্যাকমেল করা হয়।
অনেক সময় জুয়াড়ি বা বুকিরা খেলোয়াড়দের থেকে ম্যাচের গোপন তথ্য বা দলের অন্দরের খবর হাতানোর জন্যও এই ঘৃণ্য পথ বেছে নেয়। বিসিসিআই-এর মতে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা বিভিন্ন জাঁকজমকপূর্ণ পার্টির মাধ্যমেই সাধারণত এই চক্রের সদস্যরা খেলোয়াড়দের ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করে।
বোর্ডের জারি করা নির্দেশিকায় সবচেয়ে বড় অভিযোগটি তোলা হয়েছে খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত শৃঙ্খলার অভাব নিয়ে। দেখা গিয়েছে, চলতি মরসুমেই বেশ কিছু খেলোয়াড় ও সাপোর্ট স্টাফ টিম ম্যানেজমেন্টের কোনো রকম অনুমতি ছাড়াই অচেনা ব্যক্তিদের হোটেলের ঘরে প্রবেশ করতে দিয়েছেন।
অনেক ক্ষেত্রে ম্যানেজাররা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেননি যে খেলোয়াড়দের কক্ষে কারা যাতায়াত করছেন। সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া তাঁর চিঠিতে স্পষ্ট করেছেন যে, এই ধরনের উদাসীনতা পেশাদারিত্বের পরিপন্থী এবং এটি টুর্নামেন্টের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বড়সড় ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে বোর্ড তিনটি প্রধান শর্ত কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছে। সেগুলি হল–
১. অনুমতি বাধ্যতামূলক: দলের কোনো খেলোয়াড় বা সাপোর্ট স্টাফের সঙ্গে আগন্তুকের সম্পর্ক যাই হোক না কেন, টিম ম্যানেজারের আগাম অনুমতি ছাড়া কাউকে হোটেলের ঘরে ঢোকানো যাবে না।
২. সাক্ষাৎকারের স্থান: অতিথিদের সঙ্গে দেখা করার জন্য শুধুমাত্র হোটেলের লবি, রিসেপশন বা লাউঞ্জের মতো সাধারণ জায়গা ব্যবহার করতে হবে। বিশেষ ক্ষেত্রে যদি কাউকে ব্যক্তিগত ঘরে নিয়ে যেতে হয়, তবে তার জন্য লিখিত অনুমতি প্রয়োজন।
৩. মালিকদের ওপর বিধিনিষেধ: শুধু খেলোয়াড় নয়, ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকদের আচরণ নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বোর্ড। অভিযোগ উঠেছে, কিছু মালিক ম্যাচ চলাকালীন ডাগআউট বা ড্রেসিংরুমে খেলোয়াড়দের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করার চেষ্টা করছেন, যা আইসিসি ও বিসিসিআই-এর প্রোটোকল অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।
আইপিএল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং দামী ক্রিকেট লিগ। ফলে এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিপুল পরিমাণ অর্থ এবং বাজিকরদের কালো ছায়া। বিসিসিআই-এর সচিবের মতে, এই নির্দেশিকার মূল উদ্দেশ্য হলো টুর্নামেন্টের মান রক্ষা এবং খেলোয়াড়দের অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ থেকে দূরে রাখা। বোর্ড সাফ জানিয়েছে, নিয়মের কোনো রকম অন্যথা হলে কড়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ১৯তম মরসুমের দ্বিতীয় ভাগে এসে বোর্ডের এই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি আদতে ক্রিকেটারদের সুরক্ষাকবচ হিসেবেই কাজ করবে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
আপাতত এই কড়া প্রোটোকল মেনেই আইপিএলের বাকি ম্যাচগুলোতে দলগুলোকে মাঠে নামতে হবে। বিনোদনের আড়ালে কোনো অশুভ শক্তি যাতে ক্রিকেটের ক্ষতি করতে না পারে, তার জন্যই এই কঠোর অবস্থান বোর্ডের।









কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন