সমকালীন প্রতিবেদন : ভারতীয় সংগীত জগতের এক বর্ণময় ও দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান ঘটল। রবিবার, ১২ই এপ্রিল, মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন কিংবদন্তি গায়িকা আশা ভোঁসলে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। শনিবার দুপুরে লোধা আবাসনের বাসভবনে থাকাকালীন হঠাৎ অসুস্থ বোধ করেন তিনি। সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান।
চিকিৎসক প্রতীত সামদানির তত্ত্বাবধানে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চিকিৎসা শুরু হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। ফুসফুসে সংক্রমণ এবং হৃদরোগের জটিলতায় রবিবার দুপুরের দিকে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায় সেই মায়াবী কণ্ঠস্বর। মহারাষ্ট্রের সংস্কৃতি মন্ত্রী আশীষ শেলার এই দুঃসংবাদটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত শিল্পীর নশ্বর দেহ তাঁর বাসভবনে অনুরাগী ও বিশিষ্টজনদের শেষ শ্রদ্ধার জন্য রাখা হবে। এরপর বিকেল ৪টেয় মুম্বইয়ের শিবাজি পার্কে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। সুরসম্রাজ্ঞীর প্রয়াণে শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র ও সংগীত জগতের বিশিষ্টজনেরা।
১৯৩৩ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের সাঙ্গলি রাজ্যে পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকরের ঘরে জন্ম আশার। মাত্র ৯ বছর বয়সে পিতৃবিয়োগের পর বড় দিদি লতা মঙ্গেশকরের ছায়াসঙ্গী হিসেবে স্টুডিও পাড়ায় তাঁর যাতায়াত শুরু হয়। ১৯৪৩ সালে মারাঠি ছবি 'মাঝা বাই'-তে প্রথম কণ্ঠদান করেন তিনি। লতা মঙ্গেশকর যখন ধ্রুপদী আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছিলেন, আশা তখন সংগ্রাম করছিলেন নিজের স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়তে।
ক্যাবারের চপলতা থেকে বিরহের গভীরতা– আট দশকের দীর্ঘ কর্মজীবনে ২০টিরও বেশি ভাষায় ১২,০০০-এর বেশি গান গেয়ে তিনি গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম তোলেন। ভারতীয় সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি 'দাদাসাহেব ফালকে' ও 'পদ্মবিভূষণ' সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। আশা ভোঁসলের জীবন ছিল কোনো সিনেমার চিত্রনাট্যের মতোই রোমাঞ্চকর ও বৈচিত্র্যময়।
মাত্র ১৬ বছর বয়সে গণপত রাও ভোঁসলের সঙ্গে ঘর বেঁধে মঙ্গেশকর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম বড় ঝুঁকি। পরবর্তীতে ওপি নায়ারের সুরে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া এবং অবশেষে সংগীতের জাদুকর আর ডি বর্মণ বা পঞ্চমের সঙ্গে জীবন সাজানো– তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল প্রেম, বিচ্ছেদ ও বিষাদের এক সংমিশ্রণ। সন্তান হারানো শোক কিংবা দিদির সঙ্গে দীর্ঘ মান-অভিমান, কোনো কিছুই তাঁর কণ্ঠের মাধুর্যকে ম্লান করতে পারেনি।
অবাঙালি হয়েও বাঙালির কাছে আশা ভোঁসলে ছিলেন অত্যন্ত আপন। সুধীন দাশগুপ্ত ও নচিকেতা ঘোষের সুরে তাঁর গাওয়া একের পর এক আধুনিক গান আজও বাঙালির মননে উজ্জ্বল। নিখুঁত উচ্চারণে তাঁর গাওয়া রবীন্দ্রসংগীত আজও আপামর সংগীতপ্রেমীদের কাছে এক অমূল্য সম্পদ।
আজ সেই চির-উচ্ছ্বল ও প্রাণবন্ত মানুষটি চলে গেলেও রেখে গেলেন আট দশকের এক বিরাট উত্তরাধিকার। ভারতের আকাশ থেকে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র খসে পড়লেও তাঁর কণ্ঠস্বর মহাকালের পাতায় অক্ষয় ও অবিনশ্বর হয়ে থাকবে। সংগীত জগতের এক মাতৃতুল্য অভিভাবকের বিদায়ে আজ সমগ্র ভারতবর্ষ শোকস্তব্ধ।








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন