সমকালীন প্রতিবেদন : পশ্চিম এশিয়ায় ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাত ক্রমেই জটিল আকার নিচ্ছে। এক দিকে আমেরিকা ও ইজ়রায়েল, অন্য দিকে ইরান—দুই শক্তিশালী শিবিরের মুখোমুখি অবস্থানে উদ্বেগ ছড়িয়েছে গোটা অঞ্চলে। উপসাগরীয় একাধিক দেশ ইতিমধ্যেই সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে, পরিস্থিতির দিকে কড়া নজর রাখছে নয়াদিল্লিও। কেন্দ্রীয় সরকার সামগ্রিক প্রভাব খতিয়ে দেখতে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শুরু করেছে।
সংঘাতের সরাসরি অভিঘাত পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে। পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলিই বিশ্বে অপরিশোধিত তেলের অন্যতম প্রধান রফতানিকারক। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে উৎপাদন ও সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে হামলার পর কয়েক দিনের মধ্যেই তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের উপরে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ভারতের উদ্বেগের কারণ স্পষ্ট। দেশে ব্যবহৃত মোট খনিজ তেলের প্রায় ৮২ শতাংশই আমদানি-নির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেলপ্রতি এক ডলার দাম বাড়লেই ভারতের আমদানি খরচ বছরে কয়েকশো কোটি ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এতে বাণিজ্য ঘাটতি ও চলতি হিসাবের ভারসাম্যের উপর চাপ পড়বে। বিকল্প হিসেবে রাশিয়া বা লাতিন আমেরিকার বাজারের দিকে তাকানোর সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে হরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগকারী এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে বিশ্বে মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। চলতি বছরের শুরুতে ভারতের আমদানি করা তেলের অর্ধেকেরও বেশি এই পথেই এসেছে। নিরাপত্তা সঙ্কটের জেরে ট্যাঙ্কার চলাচল ব্যাহত হওয়ায় পরিবহণ ও বিমা খরচ লাফিয়ে বাড়ছে।
বিকল্প হিসাবে লোহিত সাগর বা বাব এল-মান্দেব প্রণালী ব্যবহার করা গেলেও সেখানেও অস্থিরতা রয়েছে। ফলে পশ্চিম এশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। তবে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের দাবি, আপাতত দেশের হাতে প্রায় আড়াই মাসের জ্বালানি মজুত রয়েছে। তাই তাৎক্ষণিক সরবরাহ সঙ্কটের আশঙ্কা কম। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে পারে।
শুধু পেট্রল-ডিজেল নয়, রান্নার গ্যাসের ক্ষেত্রেও চাপ বাড়তে পারে। ভারত তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় অংশই পশ্চিম এশিয়া থেকে আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে সাধারণ মানুষের হেঁশেলে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকিও তৈরি হয়।
মূল্যস্ফীতির গতিপথ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে খুচরো মুদ্রাস্ফীতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। কিন্তু জ্বালানির দাম বাড়লে সেই সমীকরণ ভেঙে যেতে পারে। মুদ্রাস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হলে সুদের হার কমানোর সুযোগও সীমিত হয়ে পড়বে, যার প্রভাব পড়বে গৃহঋণ ও গাড়িঋণের মতো ভাসমান সুদের ঋণে।
অর্থনৈতিক দিক ছাড়াও কৌশলগত উদ্বেগ রয়েছে। ইরানের চাবাহার বন্দর ও ইজ়রায়েলের হাইফা বন্দরে ভারতের বিনিয়োগ রয়েছে। সংঘাত তীব্র হলে ওই প্রকল্পগুলিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য– বিশেষত সোনা ও রাফ ডায়মন্ড আমদানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় সরকার কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার নীতি নিয়েছে। কোনও পক্ষের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন না জানিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে নয়াদিল্লি। ইতিমধ্যেই আটকে পড়া ভারতীয়দের নিরাপদে ফেরাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নৌবাহিনী ও বায়ুসেনাকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।









কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন