সমকালীন প্রতিবেদন : ভোটমুখী বাংলায় রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে তুলে সরাসরি শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। শনিবার নিউটাউনে এক জনাকীর্ণ সংবাদিক বৈঠকে তৃণমূলের গত ১৫ বছরের শাসনকালকে ‘রক্তাক্ত পশ্চিমবঙ্গের অভিশপ্ত অধ্যায়’ বলে অভিহিত করে ৪০ পাতার একটি বিস্তারিত ‘চার্জশিট’ পেশ করেন তিনি। এই সংকলনে দুর্নীতি থেকে শুরু করে অনুপ্রবেশ এবং নারী নিরাপত্তা– একাধিক ইস্যুতে মমতা ব্যানার্জীর সরকারকে তীব্র আক্রমণ শানান শাহ।
অমিত শাহের এদিনের আক্রমণের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল অনুপ্রবেশ সমস্যা। তিনি সাফ জানান, বাংলার এই নির্বাচন শুধুমাত্র ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গোটা দেশের নিরাপত্তা। শাহের দাবি, অসমে বিজেপি সরকার আসার পর অনুপ্রবেশ বন্ধ হলেও পশ্চিমবঙ্গ এখনও অনুপ্রবেশকারীদের ‘নিরাপদ চারণভূমি’ হয়ে রয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীকে সরাসরি নিশানা করে তিনি বলেন, “আপনার তোষণ ও ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির কারণে শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা আজ ঝুঁকির মুখে। অনুপ্রবেশকারীদের হাত ধরে জাল নোট ও গরু পাচারের কারবার চলছে, যা দেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে ধ্বংস করছে।” বারংবার বিএসএফ-এর ভূমিকা নিয়ে তৃণমূলের তোলা প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পাল্টা দাবি করেন, সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতার দেওয়ার জন্য রাজ্য সরকার জমি দেয়নি। শাহ প্রতিশ্রুতি দেন, “আগামী ৬ মে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র ৪৫ দিনের মধ্যে সমস্ত প্রয়োজনীয় জমি প্রদান করা হবে এবং অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করা হবে।”
বিজেপির পেশ করা এই চার্জশিটে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে নিচুতলা পর্যন্ত ‘পচন’ ধরার অভিযোগ তোলা হয়েছে। এতে ১০ হাজার কোটি টাকার রেশন দুর্নীতি, ২৬ হাজার চাকরি বাতিল হওয়া স্কুল সার্ভিস কমিশন কেলেঙ্কারি, কয়লা পাচার, লটারি ও চিটফান্ড দুর্নীতির মতো অন্তত এক ডজন বড় দুর্নীতির উল্লেখ রয়েছে। শাহের অভিযোগ, ১০০ দিনের কাজের জবকার্ড থেকে শুরু করে মিড-ডে মিল– কোনও ক্ষেত্রই দুর্নীতির হাত থেকে রেহাই পায়নি।
রাজ্যের বর্তমান অবস্থাকে ‘প্রশাসনিক অরাজকতা’ বলে বর্ণনা করে চার্জশিটে বলা হয়েছে, বাংলায় এখন ‘আইনের শাসন’ নয়, বরং ‘শাসকের আইন’ চলছে। আরজি কর, সন্দেশখালি, কামদুনি এবং পার্ক স্ট্রিটের মতো নৃশংস ঘটনাগুলির প্রসঙ্গ টেনে নারী নিরাপত্তা নিয়ে রাজ্য সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন শাহ। তাঁর মতে, রাজ্য পুলিশ বর্তমানে ‘তৃণমূলের দলদাসে’ পরিণত হয়েছে। এছাড়াও চা শ্রমিকদের দুর্দশা, রাঢ় বঙ্গে সিন্ডিকেট রাজ এবং সরকারি কর্মচারীদের ডিএ না পাওয়ার বঞ্চনাকেও এই নথিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চার্জশিটে আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভাকে অপশাসনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং বিরোধী কণ্ঠরোধ করতে কোনও স্ট্যান্ডিং কমিটিতে বিজেপি সদস্যদের রাখা হয়নি। এমনকি ভোটার তালিকা থেকে ভুয়ো নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়াতেও মুখ্যমন্ত্রী বাধা দিচ্ছেন বলে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন।
সব মিলিয়ে, শনিবারের এই কর্মসূচি থেকে অমিত শাহ স্পষ্ট করে দিলেন যে, আসন্ন নির্বাচনে দুর্নীতি ও তোষণনীতিকেই তুরুপের তাস করে তৃণমূলকে উৎখাত করতে মরিয়া গেরুয়া শিবির।








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন