সমকালীন প্রতিবেদন : সন্তান জন্ম দেবেন কি না– এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্পূর্ণ অধিকার একজন মায়ের। গর্ভস্থ সন্তানের ভবিষ্যতের থেকেও বেশি গুরুত্ব পাবে মহিলার নিজের ইচ্ছা। এই যুক্তিতেই ৩০ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা এক তরুণীর গর্ভপাতের অনুমতি দিল সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, কোনও মহিলাকে তাঁর ইচ্ছের বিরুদ্ধে মাতৃত্বে বাধ্য করা বিচারব্যবস্থার কাজ নয়।
শুক্রবার বিচারপতি বি ভি নাগরথনা এবং বিচারপতি উজ্জ্বল ভট্টাচার্যের ডিভিশন বেঞ্চ এই রায় দেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণ, যদি কোনও মহিলা সন্তান জন্ম দিতে না চান, তাহলে আদালত তাঁকে সেই সিদ্ধান্তে বাধ্য করতে পারে না।
এই মামলায় আবেদনকারী তরুণী যখন অন্তঃসত্ত্বা হন, তখন তিনি নাবালিকা ছিলেন। বর্তমানে তাঁর বয়স ১৮ বছর ৪ মাস এবং গর্ভাবস্থার সময়কাল ৩০ সপ্তাহ। এক বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্কের সূত্রেই ১৭ বছর বয়সে তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। সম্পর্কটি সম্মতিমূলক ছিল কি না, সে বিষয়ে না গিয়েই সুপ্রিম কোর্ট জানায়– মূল প্রশ্ন হল, ওই তরুণী সন্তান জন্ম দিতে চান কি না। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, মাতৃত্ব গ্রহণ করতে তিনি রাজি নন।
এর আগে ওই তরুণী বম্বে হাইকোর্টে গর্ভপাতের আবেদন জানালেও তা খারিজ হয়ে যায়। হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল, তাঁকে সন্তান জন্ম দিতেই হবে, তবে পরে চাইলে শিশুটিকে দত্তক দিতে পারবেন। কিন্তু সেই নির্দেশকে সম্পূর্ণভাবে খারিজ করে দেয় সুপ্রিম কোর্ট।
রায়ে শীর্ষ আদালত জানায়, নাবালিকা অবস্থায় গর্ভধারণ আইনত অবৈধ এবং একটি দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির ফল। এমন অবস্থায় তাঁকে সন্তান জন্ম দিতে বাধ্য করা হলে তা তাঁর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। আদালতের মতে, অবাঞ্ছিত মাতৃত্ব চাপিয়ে দেওয়া সংবিধানস্বীকৃত প্রজনন স্বাধীনতার পরিপন্থী।
মেডিক্যাল বোর্ডের রিপোর্ট পর্যালোচনা করেও আদালত জানায়, এই পর্যায়ে গর্ভপাত করালে তরুণীর স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বড় কোনও ঝুঁকি নেই। পাশাপাশি আদালত এ কথাও স্বীকার করে যে, গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলেও আবেদনকারীর স্বার্থ রক্ষা করাই এই মামলার প্রধান উদ্দেশ্য।
বিচারপতি নাগরথনা পর্যবেক্ষণে বলেন, 'আমরা কার স্বার্থ দেখব– যে সন্তান এখনও জন্মায়নি, নাকি যে মা সন্তানের জন্ম দেবেন? এমন অনেক ক্ষেত্র রয়েছে, যেখানে আইনে নির্ধারিত সময়সীমার পরেও গর্ভপাতের প্রয়োজন হয়। আদালত যদি অনুমতি না দেয়, তাহলে মহিলারা বাধ্য হয়ে হাতুড়ে বা অবৈধ চিকিৎসকদের দ্বারস্থ হবেন, যা আরও বিপজ্জনক।'
শীর্ষ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, মুম্বইয়ের জেজে হাসপাতালে সমস্ত মেডিক্যাল প্রোটোকল মেনে গর্ভপাতের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। আবেদনকারীকে লিখিতভাবে সম্মতি জানাতে হবে এবং পুরো প্রক্রিয়া আইনি ও চিকিৎসাগত নজরদারিতে সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রায়ের পর আইনি মহলে স্পষ্ট বার্তা– মহিলার, বিশেষত নাবালিকার শরীর ও মাতৃত্ব নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার একমাত্র তাঁরই। ভারতীয় আইনে সাধারণত ২০ সপ্তাহ পর্যন্ত গর্ভপাতের অনুমতি থাকলেও, বিশেষ ক্ষেত্রে ২৪ সপ্তাহ পর্যন্ত মেডিক্যাল বোর্ডের পরামর্শে এবং তার পরে শুধুমাত্র আদালতের অনুমতিতে গর্ভপাত সম্ভব। এই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট সেই ব্যতিক্রমী ক্ষমতা প্রয়োগ করে প্রজনন স্বাধীনতাকেই সর্বোচ্চ মর্যাদা দিল।









কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন