সমকালীন প্রতিবেদন : হাতে ফুলের সাজি, ফল কাটা সারা, আঙিনায় আলপনার কারুকাজ– সব প্রস্তুতিই সারা। হলুদ শাড়ি আর পাঞ্জাবিতে সেজে কচিকাঁচারা দেবীর সামনে উপোস করে বসে আছে। কিন্তু বিঘ্ন সেই একটাই, ‘পুরুতমশাই’ কখন আসবেন? বছরের এই একটি দিনে পুরোহিতের অপেক্ষায় হাপিত্যেশ করে বসে থাকা বাঙালির চিরচেনা ছবি। তবে এবার সেই চেনা ছক ভেঙে এক অভিনব দৃষ্টান্ত তৈরি করল বনগাঁর সুভাষপল্লি। প্রথাগত পুরোহিতের অনুপস্থিতিতে শাস্ত্রীয় বিধি মেনে মন্ত্রোচ্চারণ করল ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
শয়নে-স্বপনে-জাগরণে মানুষ যে দিন দিন এআই-নির্ভর হয়ে পড়ছে, সরস্বতী পুজোর পুণ্যলগ্নে বনগাঁর সুশোভন ঘোষের বাড়িতে তার এক ডিজিটাল প্রতিফলন দেখা গেল। সময়ের অভাবে হোক বা অন্য পুজোর চাপে, পুরোহিতদের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষার সমস্যা মেটাতেই এই আধুনিক প্রযুক্তির আশ্রয় নেন তিনি। সুশোভনবাবুর কথায়, “এখন সবার হাতেই ইন্টারনেট আর স্মার্টফোন। আমি যাচাই করে দেখলাম, এআই নিখুঁতভাবে সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চারণ করতে পারে। ভাবলাম, তবে কেন নয়?”
এদিন পঞ্জিকার নিয়ম মেনে প্রতিপদে কী করণীয় এবং কোন মন্ত্রে পুষ্পাঞ্জলি হবে, তার সবটাই ধাপে ধাপে নির্দেশ দিয়েছে এআই। মোবাইলের মাধ্যমে সেই সংস্কৃত মন্ত্র শুনেই পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা সমবেতভাবে অঞ্জলি প্রদান করেন। শুধু মন্ত্রপাঠই নয়, পুজোর প্রতিটি আচার ও নিয়মাবলিও এআই সহজভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে। এই ডিজিটাল পুরোহিতের পৌরোহিত্যে সামিল হয়েছিলেন পাড়ার ছোট থেকে বড়– সকলেই।
গৃহকর্ত্রী এই অভিজ্ঞতায় দারুণ খুশি। তিনি জানান, “পুরোহিতের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে ছোটরা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এবার এআই-এর সাহায্য নিয়ে আমরা নিজেদের মতো করে এবং অনেক বেশি ভক্তিভরে পুজো করতে পেরেছি। এতে মানসিক তৃপ্তি অনেক বেশি।”
তবে এই প্রযুক্তির ব্যবহারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে পুরোহিত মহলে। প্রবীণ পুরোহিতদের একাংশ একে আধুনিকতার দোহাই দিয়ে শাস্ত্রীয় অমর্যাদা বলে মনে করছেন। তাঁদের আশঙ্কা, এভাবে চললে আগামী দিনে তাঁদের পেশা সংকটের মুখে পড়তে পারে। যদিও অন্য অংশ মনে করছেন, এআই কখনোই মানুষের বিকল্প হতে পারে না, তবে সহায়ক হিসেবে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
ভবিষ্যৎ যাই হোক, বনগাঁর এই ডিজিটাল পুজো বুঝিয়ে দিল যে, বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণেও এবার পাকাপাকিভাবে জায়গা করে নিতে চলেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। বিজ্ঞান ও বিশ্বাসের এই মেলবন্ধন আগামী দিনে আরও কত চমক দেখায়, এখন সেটাই দেখার।








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন