সমকালীন প্রতিবেদন : বনগাঁর সমাজ ও শিক্ষা জগতের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হলো। প্রয়াত হলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, বামপন্থী আদর্শে দীক্ষিত সমাজকর্মী তথা মানবাধিকার আন্দোলনের লড়াকু মুখ তারাপদ মিত্র। শনিবার সকাল ৭টা নাগাদ বনগাঁর খয়রামারী এলাকার নিজস্ব বাসভবনেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন। তাঁর প্রয়াণের সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই বনগাঁর শিক্ষা, সংস্কৃতি সহ বিভিন্ন মহলে শোকের ছায়া নেমে আসে।
তারাপদ বাবুর কর্মজীবনের শুরু হয়েছিল চাঁদপাড়া ঢাকুরিয়া বিদ্যালয়ের সহ-শিক্ষক হিসেবে। তবে তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়েছে বনগাঁ রাখালদাস হাইস্কুলে। ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছে। বিশেষ করে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে তাঁর মেধা ও ছাত্রবৎসল রূপের সুখ্যাতি ছিল মহকুমা জুড়ে।
শিক্ষকতার পাশাপাশি ক্রীড়াজগতেও ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ। আজীবন মোহনবাগান অন্তপ্রাণ এই মানুষটি ফুটবল ছাড়াও ভলিবল ও ব্যাডমিন্টনে পারদর্শী ছিলেন। বহু ফুটবল ম্যাচে তাঁকে রেফারির ভূমিকায় দেখা গিয়েছে।
একদিকে খেলার মাঠ, অন্যদিকে রাজপথ– সর্বত্রই তিনি ছিলেন সমান সক্রিয়। বামপন্থী আদর্শের প্রতি তাঁর অবিচল আস্থা ছিল আমৃত্যু। মানবাধিকার সংগঠন ‘গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতি’ (APDR)-র বনগাঁ শাখার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। আজীবন ওই সংগঠনের সভাপতি হিসেবে সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় লড়াই করে গিয়েছেন। তাঁর স্পষ্টবাদিতা ও আপসহীন মনোভাব তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল।
ব্যক্তিগত জীবনে এক চরম বিয়োগান্তক ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলেন তিনি। একমাত্র সন্তান অরূপ মিত্র এক পথ দুর্ঘটনায় অকালে চলে যান। কিন্তু শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে পুত্রের স্মৃতিতে তিনি গড়ে তোলেন ‘অরূপ মিত্র স্মৃতি পাঠাগার’। কোনো সরকারি সাহায্য ছাড়াই সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজের বাসভবনেই এই পাঠাগারটি পরিচালনা করতেন তিনি, যা আজও এলাকার পড়ুয়া ও পাঠকদের কাছে এক অমূল্য সম্পদ।
এদিন তাঁর প্রয়াণে বনগাঁর শিল্পী, সাহিত্যিক এবং বিভিন্ন স্তরের সাধারণ মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। গুণমুগ্ধদের মতে, তারাপদ মিত্রের প্রয়াণ বনগাঁর সমাজজীবনের এক অপূরণীয় ক্ষতি। এদিন তাঁর মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি সহ বিভিন্ন স্তরের মানুষজনেরা। বনগাঁর মহা স্মশানেই তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। এক আদর্শনিষ্ঠ শিক্ষকের বিদায়বেলাতেও তাঁর আদর্শকে পাথেয় করার অঙ্গীকার শোনা গেল অনেকের কণ্ঠে।
ছবি ও তথ্য সহায়তা : দেবাশিস রায়চৌধুরী।








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন