সমকালীন প্রতিবেদন : রাজ্য সরকারের ওবিসি সংরক্ষণ নীতিতে বড় নির্দেশ দিল কলকাতা হাইকোর্ট। তৃণমূল সরকারের আমলে চালু হওয়া ওবিসি-এ এবং ওবিসি-বি বিভাজনকে সম্পূর্ণ অসিদ্ধ ঘোষণা করে এই ক্যাটেগরির অধীনস্থ সমস্ত শংসাপত্র বাতিল করে দিয়েছে আদালত। বুধবার বিচারপতি রাজাশেখর মান্থা ও বিচারপতি অনুজ সিংহের ডিভিশন বেঞ্চ স্পস্ট জানিয়ে দিয়েছে, রাজ্যে এখন থেকে ওবিসি শ্রেণি বিভাগে আর কোনো পৃথক ‘এ’ বা ‘বি’ ক্যাটেগরি থাকছে না। ফলে এই বিভাজনের উপর ভিত্তি করে ইতিপূর্বে জারি করা ওবিসি শংসাপত্রগুলির আইনি বৈধতা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হলো।
ডিভিশন বেঞ্চের এই চরম সিদ্ধান্তের জেরে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হতে চলেছেন রাজ্যের সেই সমস্ত চাকরিপ্রার্থী ও শিক্ষার্থীরা, যাঁরা আগের নির্দেশের পর নতুন নিয়ম মেনে ওবিসি শংসাপত্র গ্রহণ করেছিলেন। হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, সরকারি চাকরি বা উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে ওই শংসাপত্রগুলি আর কোনো কাজে আসবে না। সংশ্লিষ্ট শংসাপত্রধারীদের এখন থেকে পৃথক সংরক্ষণের আওতায় না রেখে সম্পূর্ণভাবে ‘সাধারণ শ্রেণি’ বা আনরিজার্ভড ক্যাটেগরির নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হবে। ফলে আকস্মিকভাবে ওবিসি সুবিধা হাতছাড়া হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ও চলমান নিয়োগ প্রক্রিয়াগুলি নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১০ সালের পর থেকে রাজ্যে অনগ্রসর শ্রেণীকে ‘এ’ এবং ‘বি’– এই দুইভাগে ভাগ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে এই তালিকা তৈরির নীতি এবং শংসাপত্র বন্টনে বিস্তর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে মামলা গড়ায় আদালতে। ২০২৪ সালে কলকাতা হাইকোর্ট একটি ঐতিহাসিক রায়ে ৬৬টি সম্প্রদায়কে ওবিসি তালিকা থেকে বাদ দিয়ে নতুন করে যথাযথ সমীক্ষার নির্দেশ দেয়। রাজ্য সরকার হাইকোর্টের সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানালেও শীর্ষ আদালত হাইকোর্টের রায়ই বহাল রাখে।
পরবর্তীকালে রাজ্য সরকার পুনরায় সমীক্ষা চালিয়ে ১৪২টি জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করে ওবিসি তালিকায় নতুন করে রদবদল আনে। কিন্তু এই সমীক্ষার প্রয়োগ পদ্ধতি নিয়ে ফের আদালতে অভিযোগ ওঠে। বলা হয়, মাত্র আড়াই হাজার নমুনা পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে এত বড় একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা প্রশাসনিক ও গঠনগতভাবে নীতিবহির্ভূত। নতুন তালিকার ওপর সুপ্রিম কোর্ট কোনো স্থগিতাদেশ না দেওয়ায় নতুন নিয়মে ওবিসি শংসাপত্র বিতরণের কাজ অব্যাহত ছিল।
রাজনৈতিক পালাবদল ও বিজেপি রাজ্য সরকার গঠনের পর ওবিসি-এ এবং ওবিসি-বি-র এই দ্বিমুখী কাঠামো তুলে দিয়ে সমগ্র ওবিসি সম্প্রদায়ের জন্য একক সংরক্ষণ ব্যবস্থা কার্যকর করার নীতি নেওয়া হয়। পাশাপাশি, হাইকোর্টের এই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে রাজ্যের করা পূর্ববর্তী মামলাটি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার প্রত্যাহার করে নেয়।
ফলস্বরূপ, আইনি জট ও সরকারি আবেদন প্রত্যাহারের পর বিচারপতি মান্থার ডিভিশন বেঞ্চ নতুন নিয়মে প্রাপ্ত সমস্ত ওবিসি শংসাপত্র খারিজের চূড়ান্ত নির্দেশ দিল। এই রায়ের ফলে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা বিভিন্ন সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে আইনি জটিলতা কাটবে বলে একাংশ মনে করলেও, শংসাপত্র হারানো বহু যোগ্য প্রার্থীর ভবিষ্যৎ এখন বড়সড় প্রশ্নের মুখে।








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন