সমকালীন প্রতিবেদন : ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর থেকেই সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে ক্ষমতার রাশ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে দ্বন্দ্ব চরমে উঠেছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কালীঘাট তৃণমূল’ বনাম বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘আসল তৃণমূল’ শিবিরের এই বহুচর্চিত আইনি লড়াইয়ে অবশেষে ইতি টানল আলিপুর আদালত। আদালতের সাম্প্রতিক রায়ে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, বর্ষীয়ান নেতা অরূপ রায়ের নেতৃত্বাধীন জাতীয় কর্মসমিতিই সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের যাবতীয় বিষয়আশয় পরিচালনার একমাত্র বৈধ এবং আইনি কর্তৃপক্ষ। আদালতের এই রায়ের পর স্পষ্ট হয়ে গেল যে, অরূপ রায়ের নেতৃত্বাধীন মূল সংগঠন ছাড়া অন্য কোনও পক্ষ বা ব্যক্তি নিজেদের তৃণমূল কংগ্রেসের পদাধিকারী বলে দাবি করতে পারবেন না।
নির্বাচনী ধাক্কার পর জোড়াফুল শিবিরের ছত্রাখান অবস্থায় সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি ও চাপের মধ্যে পড়েছিলেন দলের সাধারণ কর্মীরা। কোন পক্ষকে সামনে রেখে তাঁরা রাজনৈতিক ময়দানে এগোবেন, তা নিয়ে তৈরি হয়েছিল চরম ধোঁয়াশা। এই চূড়ান্ত ফয়সালা চেয়ে ঘাসফুল শিবিরের সাধারণ কর্মীরাই আলিপুর আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। সেই মামলার রায় ঘোষণা করে আদালত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়দের নেতৃত্বাধীন অংশটিকেই 'আসল তৃণমূল' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
রবিবার সাংবাদিক বৈঠক করে এই রায়ের বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে আনেন উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানান, গত ২২ জুন কলকাতার নোভোটেল হোটেলে দলের একটি বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করা হয়েছিল। সেখান থেকেই সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে দলের নতুন জাতীয় কর্মসমিতি গঠিত হয় এবং শ্রী অরূপ রায়কে সর্বভারতীয় চেয়ারপার্সন নির্বাচিত করা হয়। আদালত এই বিশেষ অধিবেশন এবং তার ভিত্তিতে গঠিত কমিটিকে একমাত্র বৈধ আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে।
আদালতের এই রায়ের ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ক্ষয়িষ্ণু শিবিরের ওপর একাধিক আইনি নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে অন্য কোনও পক্ষ বা ব্যক্তি কোনওরকম হস্তক্ষেপ বা বাধা সৃষ্টি করতে পারবেন না। অরূপ রায়ের নেতৃত্বাধীন কমিটিই দলের একমাত্র পরিচয়। দলের নাম ব্যবহার করে কোনও রাজনৈতিক নির্দেশিকা জারি করা বা কোনও স্তরে নতুন পদাধিকারী নিয়োগ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এছাড়াও, দলের সমস্ত অফিশিয়াল নথিপত্র, সংগৃহীত তহবিল, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এবং সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির ওপর অন্য শিবিরের কোনও অধিকার থাকবে না। কলকাতার মেট্রোপলিটনের ‘তৃণমূল ভবন’ বা রাজ্যের অন্য কোনও প্রান্তের দলীয় কার্যালয় সম্পূর্ণভাবে ঋতব্রত শিবিরের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকবে। নির্বাচন কমিশন বা অন্য কোনও সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ব্যবহার করে অন্য কেউ কোনওরূপ পত্রবিনিময় বা যোগাযোগ করতে পারবেন না।
সাংবাদিক বৈঠকে আদালতের নির্দেশের নথি দেখিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “এই রায়ের পর আইনের আলোয় দুধের দুধ আর জলের জল আলাদা হয়ে গেল। দলে আর গায়ের জোরে মগের মুলুক চলবে না।” তিনি স্পষ্ট করে দেন, রায়ের প্রতিলিপি ইতিমধ্যেই কর্মীদের হাতে পৌঁছেছে এবং এটি দ্রুত নির্বাচন কমিশনেও পাঠানো হবে নিজেদের দাবি আরও জোরাল করতে।
ঋতব্রত আরও হুঁশিয়ারি দেন যে, যাঁরা দলবিরোধী কাজের জন্য আজ ব্রাত্য, তাঁরা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ভাঙিয়ে আর কোনও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারবেন না। মেট্রোপলিটনের তৃণমূল ভবনে অফিস পরিচালনার রূপরেখা তৈরি করতে খুব শীঘ্রই শীর্ষ নেতারা বৈঠকে বসছেন। এরপরেও যদি কেউ জোর করে পার্টি অফিসে ঢোকার বা অধিকার ফলানোর চেষ্টা করে, তবে এই রায়ের ভিত্তিতে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ফৌজদারি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। আদালতের এই রায়কে হাতিয়ার করে এবার আগামী দিনের রাজনৈতিক ও আইনি রণকৌশল সাজাতে ব্যস্ত অরূপ রায় শিবির। অন্যদিকে, এই আইনি ধাক্কার পর কালীঘাট তৃণমূল আগামী দিনে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।








কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন