সমকালীন প্রতিবেদন : ভারতীয় মহাকাশ গবেষণার আঙিনায় রচিত হলো এক সোনালী অধ্যায়। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি দেশের প্রথম বেসরকারি অরবিটাল রকেট ‘বিক্রম-১’-এর সফল উৎক্ষেপণ সম্পন্ন হলো। শনিবার দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টারের উৎক্ষেপণ মঞ্চ থেকে মহাকাশের উদ্দেশে পাড়ি দেয় এই রকেট। হায়দরাবাদ-ভিত্তিক মহাকাশ গবেষণা বিষয়ক স্টার্টআপ সংস্থা ‘স্কাইরুট অ্যারোস্পেস’-এর এই ঐতিহাসিক অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘মিশন আগমন’। এই অভাবনীয় সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বের দরবারে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগে নিজস্ব প্রযুক্তিতে কক্ষপথে রকেট পাঠাতে সক্ষম এলিট দেশগুলির তালিকায় শীর্ষ সারিতে জায়গা করে নিল ভারত।
প্রশাসন ও ইসরো সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকাল সাড়ে ১১টায় উৎক্ষেপণের নির্ধারিত সময়ের ঠিক আগে সামান্য কারিগরি ত্রুটির কারণে কিছুক্ষণের জন্য কাউন্টডাউন স্থগিত রাখা হয়েছিল। তবে সেই সাময়িক বাধা কাটিয়ে ওড়ার পর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি বিক্রম-১-কে। রকেটের চারটি স্তরই অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কাজ করে মহাকাশের নির্দিষ্ট কক্ষপথে স্যাটেলাইট বা উপগ্রহগুলিকে পৌঁছে দিয়েছে। প্রায় ৭ তলা বাড়ির সমান উঁচু এই রকেটটি সম্পূর্ণ কার্বন কম্পোজিট দিয়ে তৈরি। এটি মূলত একটি মাল্টি-স্টেজ লঞ্চ ভেহিকল, যা ৩৫০ কেজি পর্যন্ত পেলোড বহনে সক্ষম এবং পৃথিবীর নীচের কক্ষপথে অনায়াসে পৌঁছাতে পারে। এর প্রপালশন সিস্টেম ও আধুনিক ইঞ্জিন তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে উন্নত থ্রি-ডি প্রিন্টিং প্রযুক্তি।
এই মিশনের প্রথম যাত্রায় ‘গ্রাহা স্পেস’, ‘কসমোসার্ভ’ ও ‘ডি-কিউব’-এর মতো বেশ কিছু সংস্থার প্রযুক্তি প্রদর্শনকারী পেলোড পাঠানো হয়েছে। তবে শুধু বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতিই নয়, এই রকেটের সঙ্গে মহাকাশে পাড়ি দিয়েছে কিছু আবেগঘন ঐতিহাসিক স্মারকও। যার মধ্যে অন্যতম– প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নিজের হাতে লেখা ‘বন্দে মাতরম’ পোস্টকার্ড, ইসরোর বর্তমান ও প্রাক্তন চেয়ারম্যানদের লিখিত বার্তা এবং ভারতীয় মহাকাশচারী ও স্কাইরুট কর্মীদের শুভেচ্ছা বার্তা।
ঐতিহাসিক এই সাফল্যের পরই আনন্দে ফেটে পড়েন স্কাইরুট অ্যারোস্পেসের বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়াররা। উৎক্ষেপণের পর পরই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্বয়ং ফোন করে পুরো দলকে অভিনন্দন জানান। তিনি এই সাফল্যকে “দেশের জন্য বড় অর্জন” এবং “মহাকাশ অভিযাত্রায় এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক” বলে উল্লেখ করেন। রকেটের দুই রূপকার পবন কুমার চন্দনা ও নাগা ভারত ডাকাকে উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী স্পিকারফোনে বলেন, "আপনারা শুধু মহাকাশেই নতুন চারাগাছ রোপণ করেননি, দেশের মাটিতেও এমন এক মজবুত শিকড় তৈরি করলেন যা আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। আপনারা ভারতের স্বপ্নকে মহাকাশে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।"
২০১৮ সালে ইসরোর দুই প্রাক্তন বিজ্ঞানী পবন কুমার চন্দনা এবং নাগা ভারত ডাকা মিলে গড়ে তুলেছিলেন এই স্টার্টআপ সংস্থা। ২০২২ সালে তাঁদের তৈরি ‘বিক্রম-এস’ রকেটের পর এবার ‘বিক্রম-১’-এর কক্ষপথ জয়ের মাধ্যমে সেই সাফল্য পূর্ণতা পেল। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই মিশন ভারতের মহাকাশ সংস্কার নীতির এক বিরাট জয়। ইসরোর পাশাপাশি দেশের বেসরকারি সংস্থাগুলিও যে বাণিজ্যিক মহাকাশ বাজারের হাল ধরতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত, ‘বিক্রম-১’-এর গর্জন আজ বিশ্বমঞ্চে তা সগৌরবে প্রমাণ করে দিল।






কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন