সমকালীন প্রতিবেদন : রথযাত্রার পুণ্য তিথিতেই রাজ্য রাজনীতিতে এক বিরাট ওলটপালট ঘটে গেল। তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভা সাংসদ তথা টলিউডের অত্যন্ত জনপ্রিয় অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক আচমকাই তাঁর সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। বুধবার বিকেল পর্যন্ত রাজ্যসভার সরকারি ওয়েবসাইটে সাংসদ তালিকায় রঞ্জিত-কন্যার নাম জ্বলজ্বল করলেও, বৃহস্পতিবার সকাল হতেই সম্পূর্ণ বদলে যায় চেনা ছবিটা।
সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব এবং প্রকাশ চিক বরাইকের ইস্তফার পর এবার তৃণমূলের তারকা সাংসদ কোয়েল মল্লিকের এই পদত্যাগ ঘাসফুল শিবিরের জন্য এক মস্ত বড় ধাক্কা। বৃহস্পতিবার তিনি রাজ্যসভার চেয়ারম্যান তথা উপরাষ্ট্রপতি সিপি রাধাকৃষ্ণণের সঙ্গে সশরীরে দেখা করে নিজের ইস্তফাপত্র জমা দেন। এর ফলে রাজ্যসভায় তৃণমূলের সাংসদ সংখ্যা কমে দাঁড়াল মাত্র ৯-এ।
পদত্যাগের পরপরই নতুন এক সমীকরণ তৈরি করে শোরগোল ফেলে দিয়েছেন কোয়েল। তাঁকে নয়াদিল্লির মতিলাল নেহেরু রোডে কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রী তথা পশ্চিমবঙ্গের বিজেপির কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে দেখা যায়। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সঙ্গে কোয়েলের এই বৈঠকের ছবি সামনে আসতেই রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তীব্র হয়েছে– তবে কি এবার আনুষ্ঠানিকভাবে পদ্মশিবিরে যোগ দিতে চলেছেন টলিউডের এই হেভিওয়েট তারকা?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, তৃণমূল থেকে ইস্তফা দিয়ে খুব শীঘ্রই বিজেপিতে যোগ দিতে পারেন কোয়েল। এরপর বিজেপির টিকিটে ওই শূন্য রাজ্যসভা আসনেই তাঁকে পুনরায় প্রার্থী করা হতে পারে। উল্লেখ্য, এর আগে পদত্যাগ করা তৃণমূলের তিন সাংসদ– সুখেন্দু শেখর রায়, সুস্মিতা দেব ও প্রকাশ চিক বরাইক বিজেপিতে যোগ দিয়ে ইতিমধ্যেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাজ্যসভায় প্রত্যাবর্তনের মুখে। কোয়েলও সেই পথেই হাঁটছেন বলে জল্পনা তুঙ্গে।
টলিউড অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিকের পরিবারের সঙ্গে আগে কখনও কোনো রাজনৈতিক যোগ ছিল না। সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের আগে প্রবীণ অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিকের সঙ্গে দেখা করেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপরেই কোয়েলকে রাজ্যসভায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় শাসকদল। সেইমতো গত ৬ এপ্রিল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবে শপথ নেন কোয়েল। মাত্র ২ মাস ১০ দিনের এই সংক্ষিপ্ত সাংসদ জীবনে সংসদের একটি অধিবেশনেও তাঁকে যোগ দিতে দেখা যায়নি, যদিও বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থীদের হয়ে রাজ্যজুড়ে প্রচার করেছিলেন তিনি।
গত ৪ মে রাজ্যে ক্ষমতা বদলের পর থেকেই তৃণমূলের রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত পাল্টাতে শুরু করেছে। বিধানসভা ভোটে ভরাডুবির পর থেকেই দলত্যাগের হিড়িক ওঠে। লোকসভার সিংহভাগ সাংসদ– কাকলি ঘোষ দস্তিদার, মালা রায়, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে শতাব্দী রায়, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, দেব, সায়নী ঘোষ, ইউসুফ পাঠানরা ইতিমধ্যেই এনসিপিআই দলে যোগ দিয়েছেন।
অন্যদিকে, বিধায়করা দল বা প্রতীক না ছাড়লেও নিজেদের 'আসল তৃণমূল' দাবি করে একটি নতুন লবি তৈরি করেছেন। চমকপ্রদভাবে ফিরহাদ হাকিম, মদন মিত্র, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, অরূপ বিশ্বাস, অনুব্রত মণ্ডল, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যরা নাম লিখিয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহাদের শিবিরে। ফলে বর্তমানে একদিকে ‘আসল তৃণমূল’ এবং অন্যদিকে ‘কালীঘাট-তৃণমূল’– এই দুই ভাগে বিভক্ত শাসকদল। এই টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেই কোয়েলের পদত্যাগ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের জন্য বড় ধাক্কা। গুঞ্জন উঠছে, দিল্লির দরবারে এখনও আরও কয়েকজন তৃণমূল সাংসদের পদত্যাগ বাকি রয়েছে।
দলীয় সূত্রের খবর, জুনের প্রথম দিকে যখন বাকি তিন সাংসদ ইস্তফা দেন, তখনই কোয়েলও ইমেলের মাধ্যমে নিজের ইস্তফাপত্র পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু উপরাষ্ট্রপতি সিপি রাধাকৃষ্ণণ তা গ্রহণ না করে তাঁকে সশরীরে দেখা করার নির্দেশ দেন। সেই সময় পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে কোয়েল আমেরিকায় থাকায় তাঁর সশরীরে হাজিরা দিতে কিছুটা দেরি হয়। সম্প্রতি দেশে ফিরেই তিনি বৃহস্পতিবার উপরাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে পদত্যাগপত্র জমা দেন।
বাংলা চলচ্চিত্র জগতে মল্লিক পরিবারের আভিজাত্য এবং স্বচ্ছ ভাবমূর্তি প্রশ্নাতীত। যেখানে একের পর এক দুর্নীতি ইস্যুতে টলিউডের একাংশের নাম জড়াচ্ছে, সেখানে কোয়েলের মতো একজন পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির তারকার বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়া নিশ্চিতভাবেই পদ্মশিবিরের হাত শক্ত করবে। এখন দেখার, কোয়েল মল্লিক বাকি দলত্যাগী সাংসদদের মতো গেরুয়া শিবিরের টিকিটেই আবার সংসদে ফেরেন, নাকি রাজনৈতিক টানাপোড়েন থেকে দূরে সরে গিয়ে আবারও লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের চেনা জগতেই মন দেন।









কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন