Breaking

Post Top Ad

Your Ad Spot

শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গ দিবস : একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ

West-Bengal-Day

পশ্চিমবঙ্গ দিবস : একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ 

স্বপন ঘোষ 

১৯৪৭ সালের ২০ জুন, ভারতে ব্রিটিশদের ক্ষমতা হস্তান্তর ও দেশত্যাগের ঠিক আগে, বাংলা ভাগের সিদ্ধান্ত ঘিরে বঙ্গীয় আইনসভায় একটি বিশেষ অধিবেশনে ভোটাভুটি আয়োজিত হয়। ১৯৩৫ এর ভারতশাসন আইন অনুসারে বঙ্গীয় আইনসভার মোট সদস্যসংখা ছিল ২৫০। ৩ জুনের মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা অনুসারে আইনসভার সদস্যদের ভোটাভুটিতেই বাংলা ভাগ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত স্থির করা হয়। আইনসভার সদস্যদের মধ্যে হিন্দুপ্রধান জেলার প্রতিনিধি ও মুসলিমপ্রধান জেলা প্রতিনিধি হিসাবে দুটি সুস্পষ্ট গোষ্ঠী তৈরি হয়। ২০ জুন ১৯৪৭ বঙ্গীয় আইনসভার যৌথ অধিবেশনে উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে ১২৬ জন সদস্য বাংলা প্রদেশকে অখণ্ড রেখে পাকিস্তানের সঙ্গে সংযুক্তির পক্ষে ভোট দেন এবং ৯০ জন সদস্য এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেন অর্থাৎ তাঁরা বাংলা ভাগ করে পশ্চিবঙ্গ নামে নতুন প্রদেশ গঠন এবং তার ভারতভূক্তির পক্ষে মত দেন।  

অন্যদিকে বাংলার হিন্দুপ্রধান জেলাগুলির তৎকালীন সদস্যরা ৫৮ - ২১ ভোটে বাংলা বিভাজন এবং ভারতভূক্তির পক্ষে মত দেন। মুসলিমপ্রধান জেলাগুলির তৎকালীন সদস্যরা ১০৬ - ৩৫ ভোটে বাংলা বিভাজনের বিপক্ষে থেকে ঐক্যবদ্ধ বাংলা নিয়ে পাকিস্তানে সংযুক্তির পক্ষে মত দেন। এই অবস্থায় হিন্দুপ্রধান জেলাগুলির প্রতিনিধিদের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটকে মান্যতা দিয়ে বাংলাপ্রদেশের হিন্দুপ্রধান জেলাগুলিকে নিয়ে নতুন প্রদেশ ‘পশ্চিমবঙ্গ’ গঠন ও তাকে ভারতভূক্ত করার সিদ্ধান্ত ব্রিটিশ সরকার গ্রহণ করে। এই সিদ্ধান্ত অনুসারেই ১৯৪৭ সালের ১৫ আগষ্ট ভারত স্বাধীন হয় এবং স্বাধীন ভারতের একটি প্রদেশ হিসাবে স্বীকৃত ও ভারতভূক্ত হয় পশ্চিমবঙ্গ। এই পরিপ্রেক্ষিতেই ২০ জুন তারিখকে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসাবে উদযাপনের বিষয়টি সামনে এসেছে।  

‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ প্রসঙ্গে আর একটি বিষয়ও এই মুহূর্তে আলোচনার শিরোনামে রয়েছে। সেটি হল, একটি স্বতন্ত্র অঙ্গরাজ্য হিসাবে পশ্চিমবঙ্গের জনক ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী কি না।  এই বিতৰ্ক সম্পর্কে সিদ্ধান্তে আসতে গেলে ১৯৪৫ - ৪৬ এ বঙ্গীয় আইনসভার নির্বচিত সদস্যদের তালিকায় একবার চোখ বোলানো প্রয়োজন। ২৫০ সদস্যবিশিষ্ট বঙ্গীয় আইনসভায় নির্বচিত সদস্যদের তালিকা ছিল এরকম - মুসলিম লীগ -১১৪, কংগ্রেস - ৮৬, ইণ্ডিপেণ্ডেন্ট হিন্দু - ১২, ইণ্ডিপেণ্ডেন্ট মুসলিম - ৯, কমিউনিস্ট পার্টি - ৩, হিন্দুমহাসভা  - ১ এবং অন্যান্য - ২৫। মোট - ২৫০। ১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় আইনসভার নির্বাচনে হিন্দুমহাসভার একমাত্র প্রার্থী হিসাবে জয়ী হন ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জ্জী। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, একা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জ্জী কীভাবে পৃথক পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ গঠনের সিদ্ধান্তকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।  

বিশ শতকের প্রথমার্ধের ভারতীয় রাজনীতির গতিপ্রকৃতি পর্যালোচনা এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। ১৮৯০ - এর দশকে কংগ্রেসের চরমপন্থী গোষ্ঠীর হাত ধরে ভারতীয় রাজনীতিতে হিন্দু ধর্মীয় আদর্শের অনুপ্রবেশ। প্রায় একই সময়ে সৈয়দ আহমেদ খান কংগ্রেসের বাইরে মুসলমান সমাজের পৃথক অস্তিত্বের জোরালো দাবি ব্রিটিশ সরকারের কাছে রাখেন। কংগ্রেসকেন্দ্রিক রাজনীতি ও সশস্ত্র ব্রিটিশ বিরোধিতার প্রধান কেন্দ্র তখন কলকাতা।  ঠিক এই প্রেক্ষিতে আমলাদের পরামর্শে বাংলাভাগের সিদ্ধান্ত নিলেন লর্ড কার্জন। সিদ্ধান্ত কার্যকর করার আগে ১৯০৪-এর ফেব্রুয়ারিতে পূর্ববঙ্গের মুসলিম নেতাদের বঙ্গভঙ্গ সম্পর্কে বোঝাতে কার্জন পূর্ববঙ্গ সফর করেন। পিছিয়েপড়া, ধর্মানুগ মুসলিম সমাজে পৃথকস্বত্তা প্রতিষ্ঠার একরাশ স্বপ্ন বপন করে কার্জন বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্তে মুসলিম সমাজের সমর্থন আদায় করে নিয়েছিলেন।  

১৯০৫ -এ বঙ্গভঙ্গ এবং ঠিক তার পরেই ১৯০৬ - এ মুসলিম লীগের জন্ম ভারতীয় রাজনীতিতে স্থায়ী ধর্মীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতার জন্ম দেয়। চরমপন্থী গোষ্ঠীর হিন্দু ভাবাবেগ বাদ দিলে জন্মের পর থেকে কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতৃত্ব এবং পরে গান্ধি ও তাঁর অনুগামীরা বরাবরই ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রেখেই জাতীয় আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। মুসলিম লীগের জন্মের পর লর্ড মিন্টো ও সমসাময়িক ব্রিটিশ আমলামহল মুসলিম সমাজকে ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির হাতিয়ারে পরিনত করে ফেললেন। কংগ্রেসকে পরিকল্পিতভাবে হিন্দু রাজনীতির প্রতিভূ হিসাবে উপস্থাপিত করে মুসলিমদের বিচ্ছিন্নতাবাদী স্বত্তায় জলসিঞ্চন চালিয়ে গেলেন। মুসলিম সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আবহেই ১৯১৫ - তে জন্ম নেয় অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভা। কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির বাইরে মুসলিম লীগ ও হিন্দু মহাসভা দুটি ক্রমপ্রসারমান ফাটল হিসাবে ভারতীয় রাজনীতিকে ১৯৪৭ এর দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।

১৯৪০ এ মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ গ্রহণ, ক্রিপস মিশনের ব্যর্থতা, ১৯৪৬- এ মন্ত্রী মিশনে দেশভাগের প্রস্তাব এবং ১৯৪৭ - মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনায় দেশভাগ নিশ্চিতকরণের আবহ ভারতীয়, বিশেষত বাংলার রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে এক চরম অবিশ্বাস ও দরকষাকষির পরিবেশ তৈরি করে। পরপর দুটি প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচনে প্রায় সারা ভারতে সাফল্য পেলেও বাংলায় কংগ্রেস সরকার গঠন করতে পারেনি। ফজলুল হক এবং পরে সোহরাবর্দীর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগের সরকারের ওপর জিন্নাহ ক্রমশ চাপ বাড়াচ্ছিলেন। প্রস্তাবিত পাকিস্তান রাষ্ট্রে অখণ্ড পাঞ্জাব ও বাংলা অন্তর্ভুক্তিকরণ তাঁর লক্ষ্য। ১৯৪৬ - এর পরে দেশবিভাগ যখন একরকম নিশ্চিত, তারপরে কংগ্রেসের জাতীয় নেতৃত্ব, বিধান চন্দ্র রায়, নলিনীরঞ্জন সরকার প্রমুখের প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্ব এবং মধ্যবিত্ত বাঙালি ভদ্রলোকগোষ্ঠী বাংলাবিভাগ সম্পর্কে মনস্থির করে ফেলেছিলেন।  

জাতীয় কংগ্রেস নেতৃত্ব অবাধ্য, দুর্বিনীত এবং সর্বগ্রাসী জিন্নাহ’র কুৎসিত সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সংস্রব পুরোপুরি ত্যাগ করে স্বাধীন, নতুন ভারতের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন। সেক্ষেত্রে বাংলার হিন্দুপ্রধান অঞ্চল নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ গঠন তাদের কাম্য ছিল। গান্ধির অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন তারা ত্যাগ করেন। বসুপরিবার (সুভাষ ও শরৎ) কংগ্রেস রাজনীতি থেকে সরে গেলে গান্ধি-নেহেরুপন্থী বিধানচন্দ্র ও তাঁর সহযোগীরা জাতীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সহমত হয়ে হিন্দুপ্রধান পশ্চিমবঙ্গ গঠনের মানসিক প্রস্তুতি সেরে ফেলেছিলেন। রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে বাংলায় হিন্দু মহাসভা তখনও উল্লেখযোগ্য কোনও শক্তি নয়। বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচিত বিধায়কসংখ্যা তার প্রমাণ। কিন্তু হিন্দু মহাসভার একমাত্র প্রতিনিধি হিসাবে শ্যামাপ্রসাদ নিজেকে অকিঞ্চিৎকর ভাবেননি। হিন্দুপ্রধান পশ্চিমবঙ্গ গঠন তাঁর পাখির চোখ ছিল। প্রাদেশিক কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে তিনি ধারাবাহিকভাবে সৌহাদ্যপূৰ্ণ সম্পৰ্ক গড়ে তুলেছিলেন।  

১৯৪৭ সালের মে মাসে ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের সভাপতিত্বে কংগ্রেস - হিন্দুমহাসভা যৌথ অধিবেশন এই সৌহার্দ্যের প্রমাণ। হিন্দু মহাসভার পক্ষে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জ্জী এবং মহাসভার সামাজিক - সাংস্কৃতিক শাখা ‘ভারত সেবাশ্রম সংঘ’র পক্ষে স্বামী প্রণবানন্দ মহারাজ বাংলার সামাজিক পরিসরে হিন্দু ভাবাবেগের সম্প্রচার ও সংগঠিত করার প্রয়াসকে অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করছিলেন। পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের দ্বারা অত্যাচারিত নিম্নবর্ণের হিন্দুসমাজ সংঘের উদ্যোগে সামিল হয়েছিল। বাংলায় বসবাসকারী অবাঙালি বণিকসমাজ তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থের কথা ভেবে কলকাতাকে এবং হুগলি, হাওড়া,বর্ধমান, চব্বিশ পরগণার সম্পন্ন বাঙালি-হিন্দু পরিমণ্ডলকে ভারতের অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে অতিসক্রিয় হয়েছিলেন।  বিড়লা, ঈশ্বরদাস জালান, গোয়েঙ্কা প্রভৃতি বাণিজ্যিক পরিবার পৃথক পশ্চিমবঙ্গ গঠনের ব্যাপার ওতঃপ্ৰোত সংযুক্ত ছিলেন। 

                              

এই রাজনৈতিক বাতাবরণে কেবল একটি ক্ষেত্রে বিপরীত উদ্যোগ দেখা গিয়েছিল। ১৯৪৬ সালের জানুয়ারি মাসে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি থেকে পদত্যাগ করে সুভাষচন্দ্র বসুর দাদা শরৎচন্দ্র বসু দেশবিভাগের ক্ষেত্ৰে একটি বিকল্প উদ্যোগ কার্যকর করতে সক্রিয় হয়েছিলেন। শরৎচন্দ্র মুসলিম লীগের সোহরাবর্দীগোষ্ঠীর সঙ্গে যৌথভাবে একটি ‘অখণ্ড, স্বাধীন, সার্বভৌম’ বাংলা প্রদেশ গঠনে সচেষ্ট হন। কিন্তু ফরওয়ার্ড ব্লকে যোগ দেওয়ার পর কংগ্রেসে শরৎচন্দ্রের গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। আর সোহরাবর্দীর ভূমিকা গোড়া থেকেই সন্দেহজনক ছিল। স্বাধীন বাংলার সর্বময় কর্তা হওয়ার সুখস্বপ্ন তাঁকে আপ্লুত করলেও জিন্না ও পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজের প্রভাব তিনি এড়াতে পারেননি।  ফলে এই পরিকল্পনা গোড়াতেই ব্যর্থ হয়।  ঠিক এই প্রক্ষিতেই ১৯৪৭ - এর ২০ জুনকে এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জ্জীকে আমাদের বিচার করতে হবে। ‌


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন