সমকালীন প্রতিবেদন : বাংলার রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব এবং ঐতিহাসিক পালাবদলের ছবি স্পষ্ট হয়ে উঠল। দীর্ঘ জল্পনার অবসান ঘটিয়ে এবার সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে থাকা বিদ্রোহী ২০ জন সাংসদ একযোগে যোগ দিতে চলেছেন চার বছরের পুরোনো একটি রাজনৈতিক দলে। ত্রিপুরার এই দলটির নাম ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’।
এই নতুন দলের ছত্রছায়ায় এসেই তাঁরা বিজেপির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় শাসকজোটে সামিল হতে চলেছেন। দলবদলের এই চাঞ্চল্যকর খবরের সত্যতা স্বীকার করে নিয়েছেন খোদ তৃণমূলের প্রবীণ সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। দীর্ঘদিন ধরেই দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছিল লোকসভার এই ২০ জন সাংসদের। অবশেষে রবিবার সন্ধ্যায় সমস্ত জল্পনা সত্যি করে দিল্লির রাজনৈতিক অলিন্দে চরম নাটকীয়তার সৃষ্টি হয়।
প্রথমে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষদস্তিদার, শতাব্দী রায়, দীপক অধিকারী ওরফে দেব, সায়নী ঘোষ, মিতালি বাগ, জুন মালিয়া, ইউসুফ পাঠান, পার্থ ভৌমিক, মালা রায়, অসিত মাল ও অরূপ চক্রবর্তীদের মতো হেভিওয়েট ২০ জন সাংসদ। সেখান থেকে বৈঠক শেষ করেই তাঁরা সোজা হাজির হন লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লার বাসভবনে। অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করে তাঁরা নিজেদের এই বড় সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে আসেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলত্যাগ বিরোধী আইন এবং অন্য কোনও রকম আইনি জটিলতা এড়াতেই এই কৌশলী পথ বেছে নিয়েছেন জোড়াফুল প্রতীকে জিতে আসা এই বিদ্রোহীরা। প্রথমে ভাবা হয়েছিল তৃণমূলের একটি স্বতন্ত্র শাখা বা আসল দল হিসেবে নিজেদের দাবি করবেন তাঁরা। কিন্তু রবিবার বিকেলেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগত দুই সাংসদ কীর্তি আজাদ ও সাগরিকা ঘোষ লোকসভার অধ্যক্ষের কাছে ছোটেন। তাঁরা তৃণমূলের লোকসভার দলনেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি চিঠি অধ্যক্ষের হাতে তুলে দেন। ওই চিঠিতে স্পষ্ট অনুরোধ করা হয়, দল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া কোনও গোষ্ঠী বা উপদলকে যেন লোকসভায় কোনওভাবেই স্বীকৃতি দেওয়া না হয়।
তৃণমূল নেতৃত্বের এই তৎপরতার পরেই আইনি লড়াইয়ে নিজেদের পিঠ বাঁচাতে তড়িঘড়ি অন্য একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বিদ্রোহীরা। সেই সূত্রেই উঠে আসে ত্রিপুরার এই দলটির নাম, যারা মূলত অসম, ত্রিপুরা এবং পশ্চিমবঙ্গে কাজ করে থাকে। নির্বাচন কমিশনের নথিতে এই দলের নাম কিছুটা ভিন্নভাবে নথিভুক্ত থাকলেও, রাজনীতিতে এটি একেবারেই অনামী ও ছোট একটি দল।
২০২৩ সালে ত্রিপুরা থেকে এই দলের পঞ্জীকরণ বা রেজিস্ট্রেশন হয়। মূলত কিছু সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেই যুক্ত থাকে তারা এবং ভোটে লড়াইয়ের বিশেষ কোনও ইতিহাস এদের নেই। ২০২৩ সালের ত্রিপুরার বিধানসভা নির্বাচনে ধলাই জেলার চৌমানু কেন্দ্র এবং ঊনকোটির কৈলাশহর কেন্দ্র থেকে এই দলের প্রার্থী জাহাঙ্গির আলি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও অত্যন্ত সামান্য ভোট পেয়েছিলেন। এই দলের প্রতিষ্ঠাতা কে বা কারা, সে বিষয়েও ত্রিপুরার রাজনীতিতে বিশেষ তথ্য নেই।
রাজনীতিতে পরিচিত নাম না হলেও, এই দলটির সঙ্গে কেন্দ্রীয় শাসকজোটের সম্পর্ক বরাবরই বন্ধুত্বপূর্ণ। ফলে আইনি জটিলতা এড়ানোর পাশাপাশি নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে এই দলকেই উপযুক্ত মঞ্চ হিসেবে বেছে নিয়েছেন বাংলার ২০ জন সাংসদ। সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই নতুন দলে যোগ দিলেও লোকসভায় তাঁদের পূর্ণ সমর্থন থাকবে কেন্দ্রীয় শাসকজোটের প্রতিই। এর ফলে জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি বাংলার রাজনীতিতেও এক নতুন সমীকরণ তৈরি হতে চলেছে।

.jpeg)







কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন