Breaking

Post Top Ad

Your Ad Spot

মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬

ওড়িশার আপত্তিতে দিঘার মন্দির থেকে সরল ‘ধাম’ শব্দ, নতুন নাম ‘জগন্নাথ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’

 

Jagannath-Temple-of-Digha

সমকালীন প্রতিবেদন : দিঘার নবনির্মিত জগন্নাথ মন্দিরকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের চলা বিতর্কের অবসান ঘটাল রাজ্য সরকার। ওড়িশাবাসী, সনাতনী হিন্দু এবং জগন্নাথ ভক্তদের ধর্মীয় ভাবাবেগকে মান্যতা দিয়ে ওই মন্দির থেকে অবশেষে ছেঁটে ফেলা হলো ‘ধাম’ শব্দবন্ধটি। মঙ্গলবার নবান্নে পুরীর বিজেপি সাংসদ সম্বিত পাত্রের উপস্থিতিতে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে এই তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান, দিঘার এই মন্দিরটি এখন থেকে ‘শ্রী শ্রী জগন্নাথ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ নামে পরিচিত হবে। তবে নামের বদল ঘটলেও মন্দিরের প্রাত্যহিক ধর্মীয় রীতিনীতিতে কোনো প্রভাব পড়বে না। শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনেই প্রতিদিন সেখানে পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে জগন্নাথ দেবের পুজো সম্পন্ন হবে।

তৃণমূল সরকারের আমলে দিঘায় নির্মিত এই জগন্নাথ মন্দিরের নামকরণে ‘ধাম’ শব্দ যোগ করা নিয়ে প্রথম থেকেই রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মহলে জলঘোলা হচ্ছিল। এ দিন ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝির একটি বিশেষ চিঠি নিয়ে ওড়িশার প্রতিনিধি হিসেবে নবান্নে হাজির হন পুরীর সাংসদ সম্বিত পাত্র। ওড়িশা সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কোনো স্থানকে হুট করে ‘ধাম’ আখ্যা দেওয়া সনাতন সংস্কৃতির পরিপন্থী এবং তা জগন্নাথ ভক্তদের অনুভূতিকে আঘাত করেছে। সেই প্রস্তাব ও আপত্তিকে মান্যতা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “তৃণমূল সরকার ‘ধাম’ শব্দটি ব্যবহার করে সনাতন সংস্কৃতিকে অপমান করেছিল। আমরা ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রীর প্রস্তাব গ্রহণ করে দিঘার ওই ক্যাম্পাস থেকে ‘ধাম’ শব্দ সরিয়ে দিচ্ছি।”

মুখ্যমন্ত্রী এদিন নামকরণের বিরোধিতার সপক্ষে আভিধানিক ও শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যাও স্পষ্ট করেন। ভাষা ও শাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ধাম’ শব্দটির একটি সুনির্দিষ্ট গভীর সংজ্ঞা রয়েছে। সাধারণ অর্থে ‘ধাম’ মানে বাসস্থান বা তীর্থক্ষেত্র হলেও, প্রকৃত তীর্থস্থান হতে গেলে সেখানে সংশ্লিষ্ট দেবতা বা মহাপুরুষের লীলা কিংবা অধিষ্ঠানক্ষেত্র হওয়া বাধ্যতামূলক। যেমন, শ্রীচৈতন্যদেবের জন্মস্থান হওয়ায় নদিয়ার নবদ্বীপ ‘ধাম’ হিসেবে পুজিত। দিঘার ক্ষেত্রে এমন কোনো ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক ভিত্তি নেই।

হিন্দু ধর্ম অনুসারে আদি শঙ্করাচার্য প্রতিষ্ঠিত নির্দিষ্ট চারটি ধাম হলো– পুরী, বদ্রীনাথ, দ্বারকা এবং রামেশ্বর। এর বাইরে যেকোনো নতুন মন্দিরকে ‘ধাম’ বলা শাস্ত্রসম্মত নয়। শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী ‘ধাম’ কথার অর্থ তেজ বা জ্যোতি। তেজোদ্দীপ্ত কেউ কোথাও আবির্ভূত হলে তবেই তা ধাম হিসেবে স্বীকৃতি পায়, যা দিঘার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

বিরোধী দলনেতা থাকাকালীনই শুভেন্দু অধিকারী এই নামকরণ এবং পূর্বতন সরকারের ‘দুয়ারে প্রসাদ’ প্রকল্প (যেখানে তৃণমূল ঘনিষ্ঠদের প্রসাদ বিতরণের দায়িত্ব দিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল) নিয়ে সরব হয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি মায়াপুর ইসকনে গিয়েও এই বিষয়ে আলোচনা করেন।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কথায়, “দিঘার মন্দিরটি আদতে ‘শ্রী শ্রী জগন্নাথ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ হিসেবেই হিডকোর টেন্ডারে নথিভুক্ত রয়েছে। এই স্থাপত্যটি মন্দির নামেই পরিচিত হবে এবং সম্পূর্ণ সনাতন সংস্কৃতির রীতিনীতি মেনেই সেখানে পুজো-অর্চনা চলবে।”

তৃণমূল জমানার ‘শ্রী শ্রী জগন্নাথ ধাম কালচারাল সেন্টার’ এবং ইসকনকে পুজোর দায়িত্ব দেওয়ার পর যে বিতর্কের সূচনা হয়েছিল, বর্তমান রাজ্য সরকারের এই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তের ফলে তার আইনি ও শাস্ত্রীয় অবসান ঘটল। সনাতন সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে অক্ষুণ্ণ রাখতেই রাজ্য প্রশাসনের এই পদক্ষেপ বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।‌



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন