Breaking

Post Top Ad

Your Ad Spot

বুধবার, ৪ মার্চ, ২০২৬

রঙের আবিরে ঘুচলো ভেদাভেদ: দরগা চত্বরে সম্প্রীতির ‘সুফি হোলি’

'Sufi-Holi'-of-harmony

সমকালীন প্রতিবেদন : বসন্তের তপ্ত হাওয়ায় উড়ছে লাল-নীল-হলুদ আবির। তবে এই রঙ কেবল ঋতু পরিবর্তনের নয়, এ রঙ মিলনের। উত্তরপ্রদেশের বারাবাঙ্কির বিখ্যাত দেবা শরিফ দরগা চত্বর সাক্ষী থাকল এক অনন্য দৃশ্যের। যেখানে সুফি সাধক হাজি ওয়ারিস আলি শাহের মাজার চত্বরে একইসঙ্গে ধ্বনিত হলো ‘আল্লাহু আকবর’ এবং ‘জয় শ্রী রাম’। জাতপাত আর ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে হাজার হাজার মানুষ শামিল হলেন শতাব্দীপ্রাচীন ‘সুফি হোলি’ উৎসবে।

ঊনবিংশ শতকের প্রখ্যাত সুফি সাধক হাজি ওয়ারিস আলি শাহ আজীবন শিখিয়ে গেছেন সর্বধর্ম সমন্বয়ের পাঠ। তাঁর দর্শনের মূল ভিত্তিই ছিল– ‘যে রব, সেই রাম’। সেই ঐতিহ্যকে পাথেয় করেই প্রতি বছর হোলির দিন দেবা শরিফ হয়ে ওঠে এক জীবন্ত ক্যানভাস। গোলাপের পাপড়ি আর আবিরের মিশ্রণে তৈরি হয় এক মায়াবী আধ্যাত্মিক পরিবেশ। হিন্দু-মুসলিম-শিখ নির্বিশেষে ভক্তরা একে অপরকে রাঙিয়ে দেন, চলে কোলাকুলি আর শুভেচ্ছা বিনিময়।

স্থানীয় লোকগাঁথা অনুযায়ী, এই মাজারের সমাধিটি নির্মাণ করেছিলেন সাধকের পরম ভক্ত রাজা পঞ্চম সিংহ। এক মুসলিম পীরের মাজার হিন্দু রাজার হাতে নির্মিত হওয়ার এই ঘটনাই এখানকার অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতির বীজ বুনে দিয়েছিল। আজও বহু হিন্দু ধর্মাবলম্বী ওয়ারিস আলি শাহকে শ্রীকৃষ্ণের অবতার হিসেবে জ্ঞান করেন। এলাকার বাড়ি বা গাড়িতে ভক্তিভরে লেখা থাকে ‘ওয়ারিস সরকার’। উল্লেখ্য যে, অনেক সময় হোলির দিন এখানে মুসলিমদের তুলনায় হিন্দু পুণ্যার্থীদের ভিড়ই বেশি লক্ষ্য করা যায়।

প্রায় ৪০ বছর ধরে এই উৎসবে নিয়মিত যোগ দিচ্ছেন প্রতাপ জয়সওয়াল। আপ্লুত কণ্ঠে তিনি জানান, “একবার এখানে এসে বসন্তের রঙে যে টান অনুভব করেছিলাম, তা আজও আমাকে টেনে আনে। দেবা শরিফ মানেই মিলনের বার্তা।” আবার মাহোবা থেকে আসা মহম্মদ নাতীকের মতে, উৎসবের আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে যায় যখন রমজান ও হোলি একই সময়ে পড়ে। তাঁদের কাছে রঙ বা উপবাস– সবটাই স্রষ্টাকে পাওয়ার ভিন্ন পথ মাত্র।

যখন জনপরিসরে ধর্মীয় বিভাজন নিয়ে নানা বিতর্ক দানা বাঁধে, তখন দেবা শরিফ দেখিয়ে দেয় সহাবস্থান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার প্রকৃত রূপ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষের ভিড়ে এখানে পরিচয় ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে মানবিকতা।

হোলির এই উৎসব শেষ হয়ে যাবে, মানুষের গায়ের রঙ ধুয়ে যাবে জলের ধারায়। কিন্তু দেবা শরিফের ধুলোয় মিশে থাকা ভ্রাতৃত্বের যে অমোঘ স্মৃতি ভক্তরা বয়ে নিয়ে ফিরছেন, তা মুছবার নয়। শতাব্দীপ্রাচীন এই প্রথা আজও মনে করিয়ে দেয়– বিশ্বাস আলাদা হলেও হৃদয়ের রঙ আসলে একই।‌




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন